বসতি ভূগোল (Settlement Geography)
১.১ বসতি ভূগোল: সংজ্ঞা, প্রকৃতি ও ক্ষেত্র (Elaborated)
সংজ্ঞা (Definition)
বসতি ভূগোল হলো মানব ভূগোলের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা, যা পৃথিবীর পৃষ্ঠে মানব বসতির সৃষ্টি, অবস্থান (location), বিন্যাস বা প্যাটার্ন (pattern), অভ্যন্তরীণ গঠন (form), কার্যকারিতা বা কাজ (function) এবং এর সময়ের সাথে বিকাশের প্রক্রিয়া (development process) নিয়ে বিজ্ঞানসম্মতভাবে অধ্যয়ন করে। এই শাখাটি মূলত গ্রামীণ ও শহুরে উভয় প্রকার বসতির উৎপত্তিগত কারণ, ধারাবাহিক বিবর্তন, বর্তমান কাঠামো এবং এর সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সমস্যাগুলো বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা প্রদান করে। সংক্ষেপে, এটি মানুষ এবং তার নির্মিত বাসস্থানের মধ্যেকার জটিল সম্পর্কটি বোঝার চেষ্টা করে।
প্রকৃতি (Nature)
বসতি ভূগোলের প্রকৃতি একাধিক বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে গঠিত:
মানবিক ভূগোলের অংশ (Part of Human Geography): বসতি ভূগোল মানুষের তৈরি পরিবেশ, অর্থাৎ মানব সমাজ ও ভূপৃষ্ঠের উপর তার স্থায়ী আবাসস্থল—এই দুয়ের মধ্যেকার পারস্পরিক সম্পর্ক এবং মিথস্ক্রিয়া নিয়ে কাজ করে। এটি মানুষের সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কার্যকলাপের প্রতিফলন হিসেবে বসতিকে দেখে।
সমন্বয়ী বিষয় (Integrative Subject): বসতি ভূগোলের আলোচনার জন্য শুধুমাত্র ভৌগোলিক তথ্যই যথেষ্ট নয়। এটি একটি আন্তঃশাস্ত্রীয় বা সমন্বয়ী বিষয়, যা বসতির জন্ম ও বিকাশের কারণ হিসেবে ভৌগোলিক (যেমন - ভূ-প্রকৃতি, জলবায়ু), অর্থনৈতিক (যেমন - জীবিকা, বাণিজ্য), সামাজিক (যেমন - জাতি, ধর্ম, সংস্কৃতি) এবং ঐতিহাসিক (যেমন - ঔপনিবেশিক প্রভাব, প্রাচীন ইতিহাস) দিকগুলো একইসাথে বিবেচনা করে একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে।
প্রয়োগমূলক দিক (Applied Aspect): বসতি ভূগোল কেবল তাত্ত্বিক আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ নয়; এর একটি শক্তিশালী প্রয়োগমূলক দিক রয়েছে। এই শাখার জ্ঞান নগর ও গ্রাম পরিকল্পনা (Urban and Rural Planning), আবাসন নীতি প্রণয়ন, আঞ্চলিক উন্নয়ন কর্মসূচি এবং পরিকাঠামো নির্মাণে সরাসরি ব্যবহৃত হয়। এটি টেকসই বসতি গড়ে তোলার জন্য নীতি নির্ধারকদের সাহায্য করে।
গতিশীলতা (Dynamic Nature): বসতি কোনো স্থির বা অপরিবর্তনীয় বিষয় নয়। সময়ের সাথে সাথে অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও সামাজিক পরিবর্তনের ফলে বসতির অবস্থান, আকার, কার্যকারিতা এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোও পরিবর্তিত হতে থাকে। বসতি ভূগোল এই পরিবর্তনশীলতা বা গতিশীলতাটি নিয়মিত অধ্যয়ন করে এবং এর পেছনের কারণগুলো বিশ্লেষণ করে।
ক্ষেত্র বা পরিধি (Scope)
বসতি ভূগোলের পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক এবং এটি মানব জীবনের প্রায় সকল দিককে স্পর্শ করে। এর প্রধান ক্ষেত্রগুলো নিম্নরূপ:
---
১.২ গ্রামীণ বসতি: স্থান ও অবস্থান, ধরন ও বিন্যাস (5 নম্বর)
স্থান (Site) ও অবস্থান (Situation)
গ্রামীণ বসতি অধ্যয়নের ক্ষেত্রে এর স্থান ও অবস্থান এই দুটি ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১. স্থান (Site):
স্থান বলতে বোঝায় বসতির প্রকৃত ভৌগোলিক অবস্থান (absolute location), অর্থাৎ যে নির্দিষ্ট জমিতে বসতিটি গড়ে উঠেছে তার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য। এটি মূলত অভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভরশীল।
নিয়ামকসমূহ: বসতি গড়ে ওঠার জন্য নির্বাচিত স্থানের প্রাকৃতিক পরিবেশের কিছু মৌলিক উপাদান স্থানকে প্রভাবিত করে।
ভূমির উচ্চতা ও ঢাল: সাধারণত মানুষ সমতল বা সামান্য ঢালু জমিকে বসতির জন্য পছন্দ করে, যা বন্যা বা জল জমার ঝুঁকি কমায়।
মাটির ধরন: উর্বর পলিমাটি বা দোআঁশ মাটি কৃষিকাজের উপযোগী হওয়ায় বসতি স্থাপনের জন্য আদর্শ।
জলবায়ু: বসতি স্থাপনের জন্য চরমভাবাপন্ন নয়, এমন অনুকূল জলবায়ুযুক্ত অঞ্চল কাম্য।
জলের উৎস: পানীয় জল, গৃহস্থালী ও কৃষিকাজের জন্য জলের সহজলভ্যতা (নদী, হ্রদ, ঝর্ণা, ভূগর্ভস্থ জল) একটি প্রধান নিয়ামক।
উদাহরণ: নদীর তীরে অবস্থিত গ্রাম, পাহাড়ের পাদদেশে স্থাপিত বসতি, বিস্তীর্ণ সমতল ভূমিতে গড়ে ওঠা জনপদ ইত্যাদি।
২. অবস্থান (Situation):
অবস্থান বলতে বোঝায় বসতির আপেক্ষিক অবস্থান (relative location), অর্থাৎ বসতিটি তার পারিপার্শ্বিক অন্যান্য স্থান, যেমন— শহর, বাজার, রাস্তা, অন্যান্য বসতির সাপেক্ষে কোথায় অবস্থিত। এটি মূলত বাহ্যিক পরিবেশ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
নিয়ামকসমূহ: অন্যান্য স্থানের সাথে বসতির সংযোগ ও সম্পর্কের ভিত্তিতে অবস্থান নির্ধারিত হয়।
যোগাযোগ ব্যবস্থা: গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথ, রেলপথ বা জলপথের কাছাকাছি অবস্থান অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিধা প্রদান করে।
পার্শ্ববর্তী পরিষেবা কেন্দ্র: কাছাকাছি কোনো বাজার বা ছোট শহরের উপস্থিতি বসতির অর্থনৈতিক কার্যকলাপে প্রভাব ফেলে।
অর্থনৈতিক কার্যকলাপের কেন্দ্র: কৃষি জমি, বনাঞ্চল, খনিজ সম্পদ বা শিল্পাঞ্চলের নৈকট্য বসতির অবস্থানের গুরুত্ব বাড়ায়।
প্রতিরক্ষা: অতীতে সামরিক বা প্রাকৃতিক আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে (যেমন: দুই নদীর সংগমস্থল) বসতি গড়ে উঠত।
উদাহরণ: দুই নদীর সংগমস্থলে অবস্থিত গ্রাম (যেখান থেকে জলপথের সুবিধা পাওয়া যায়), কোনো প্রধান রাজপথের ধারে গড়ে ওঠা বসতি, ঘন বনাঞ্চলের কাছে অবস্থিত কাঠ সংগ্রহকারী জনপদ ইত্যাদি।
খ. গ্রামীণ বসতির ধরন (Types)
গ্রামীণ বসতির ধরনকে প্রধানত দুটি মাপকাঠিতে ভাগ করা যায়:
১. আকার অনুযায়ী (Based on Size/Population):
বসতির মোট জনসংখ্যা বা বসতির আয়তনের ভিত্তিতে এই প্রকারভেদ করা হয়।
২. আকৃতি অনুযায়ী (Based on Shape/Pattern):
বসতির মধ্যে বাড়িঘর এবং রাস্তাঘাটের বিন্যাস ও জ্যামিতিক নকশার ভিত্তিতে এই শ্রেণিবিন্যাস করা হয়। এই বিন্যাসকে গ্রামীণ বসতির বিন্যাস (Rural Settlement Pattern) বলা হয়।
গ. গ্রামীণ বসতির বিন্যাসের নিয়ামকগুলো (Factors affecting Pattern)
কোনো অঞ্চলে গ্রামীণ বসতি কী ধরনের বিন্যাস বা আকৃতি নেবে, তা নিম্নলিখিত নিয়ামকগুলোর দ্বারা প্রভাবিত হয়:
১. ভৌগোলিক বা প্রাকৃতিক নিয়ামক:
জলবায়ু ও জলের উৎস: নদী, হ্রদ বা ঝর্ণার আশেপাশে সাধারণত সংকুচিত বসতি গড়ে ওঠে।
ভূমির বন্ধুরতা: পাহাড়ি বা বন্ধুর এলাকায় সাধারণত বিক্ষিপ্ত বসতি দেখা যায়।
মাটি: উর্বর পলিমাটির অঞ্চলে কৃষিকাজের সুবিধার জন্য সংকুচিত বসতি গড়ে ওঠে।
ভূ-প্রকৃতি: সমতল ভূমিতে আয়তাকার বা পুঞ্জীভূত বসতি, আর রাস্তা বা নদী বরাবর রৈখিক বসতি দেখা যায়।
২. অর্থনৈতিক নিয়ামক:
কৃষিজমি ও জীবিকা: কৃষিজমি বা চারণভূমির কাছাকাছি এককভাবে বাড়ি তৈরি হলে বিক্ষিপ্ত বসতি দেখা যায়।
বাজার ও বাণিজ্য: বাজার বা অর্থনৈতিক কেন্দ্রের কাছাকাছি সংকুচিত বসতি গড়ে ওঠে।
শিল্প ও খনিজ: কোনো বিশেষ অর্থনৈতিক কার্যকলাপের কেন্দ্রে শ্রমিকদের জন্য সংকুচিত বা রৈখিক বসতি তৈরি হতে পারে।
৩. সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নিয়ামক:
জাতি, ধর্ম ও পরিবার: একই জাতি বা ধর্মের মানুষ একসাথে বসবাস করার প্রবণতা থেকে সংকুচিত বসতি তৈরি হতে পারে। যৌথ পরিবার বা গোষ্ঠীর প্রাধান্যও বিন্যাসকে প্রভাবিত করে।
সাংস্কৃতিক কেন্দ্র: মন্দির, মসজিদ বা অন্যান্য উপাসনালয়কে কেন্দ্র করে বৃত্তাকার বা পুঞ্জীভূত বিন্যাস দেখা যেতে পারে।
৪. ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক নিয়ামক:
প্রাচীন বসতি স্থাপন: প্রাচীনকালে নিরাপত্তার প্রয়োজনে দুর্গ বা প্রশাসনিক কেন্দ্রকে ঘিরে সংকুচিত বসতি গড়ে উঠত।
আক্রমণ বা প্রতিরক্ষা: অতীতের সামরিক আক্রমণের ইতিহাস বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয় মানুষকে একত্রিত হয়ে সংকুচিত বসতি তৈরি করতে উৎসাহিত করত।
পরিকল্পনা: আধুনিককালে সরকার বা কর্তৃপক্ষ দ্বারা পরিকল্পিতভাবে বসতি স্থাপন করা হলে আয়তাকার বা অন্যান্য জ্যামিতিক বিন্যাস তৈরি হয়।
১.৩ শহুর বসতি: শহরের শ্রেণীবিভাগ (5 নম্বর)
শহর বা নগর বসতি হলো একটি বৃহৎ, ঘনবসতিপূর্ণ এবং স্থায়ী বসতি, যেখানে অধিকাংশ মানুষ কৃষি ছাড়া অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের (যেমন শিল্প, বাণিজ্য, পরিষেবা) সাথে যুক্ত থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন ভূ-বিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী এবং নগর পরিকল্পনাবিদ শহরকে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে শ্রেণীবিভাগ করেছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি শ্রেণীবিভাগ নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
১. C.D. Harris-এর শ্রেণীবিভাগ (1943)
আমেরিকান ভূ-বিজ্ঞানী চালর্স ডিন হ্যারিস (C.D. Harris) ১৯৪৩ সালে শিকাগো শহরের অর্থনৈতিক ও ভূমির ব্যবহারের ভিত্তিতে শহরের অভ্যন্তরীণ গঠনকে আটটি প্রধান অঞ্চলে ভাগ করেন। এই মডেলটি মূলত একটি আদর্শ মডেল, যা সময়ের সাথে সাথে শহরের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর পরিবর্তনকে তুলে ধরে।
২. Nelson-এর ফাংশনাল শ্রেণীবিভাগ (1955)
আমেরিকান নগর ভূগোলবিদ Howard J. Nelson ১৯৫৫ সালে আমেরিকান শহরগুলোর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বা "ফাংশন"-এর ভিত্তিতে একটি বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিভাগ তৈরি করেন। তিনি প্রতিটি শহরের কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর ডেটা বিশ্লেষণ করে এই মডেলটি দেন। এই মডেলটি শহরের প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তি বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নেলসন শহরগুলোকে ৯টি কার্যকরী শ্রেণীতে ভাগ করেন। প্রতিটি শহরের জন্য একটি নির্দিষ্ট কোড ব্যবহার করা হয়, যা তার প্রধান ও গৌণ কার্যক্রমকে নির্দেশ করে।
গুরুত্ব: নেলসন শহরের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ভিত্তিতে শ্রেণীবিভাগ করেন। এটি একটি পরিমাণগত (Quantitative) মডেল। এই মডেল শহরগুলির অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং তাদের বিশেষীকরণ বুঝতে সাহায্য করে, যা শহরগুলির ভবিষ্যতের পরিকল্পনা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সম্পদ বরাদ্দে অত্যন্ত সহায়ক।
৩. Lewis Mumford-এর শ্রেণীবিভাগ
বিখ্যাত নগর পরিকল্পনাবিদ ও দার্শনিক লুইস ম্যামফোর্ড (Lewis Mumford) শহরকে একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে দেখেন। তিনি মনে করেন, শহর মানুষের দ্বারা তৈরি, তাই মানুষের মতোই এর জন্ম, বিকাশ এবং পতন ঘটতে পারে। তিনি মূলত ঐতিহাসিক বিকাশ এবং নৈতিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে শহরের বিবর্তনকে ছয়টি যুগে ভাগ করেছেন।
ম্যামফোর্ডের মত: তিনি মনে করেন, শহর মানুষের সৃষ্টি, তাই এটি মানুষের মতো বাঁচতে পারে বা মরতে পারে। তিনি যান্ত্রিক, দূষিত ও শোষক শহরের তীব্র সমালোচনা করেন এবং মানবিক পরিকল্পনার (Humanistic Planning) পক্ষে মত দেন, যেখানে শহরের নকশা মানুষের চাহিদা, স্বাস্থ্য এবং সুখকে প্রাধান্য দেবে।
৪. অশোক মিত্রের শ্রেণীবিভাগ (ভারতীয় প্রসঙ্গে)
ভারতের প্রখ্যাত জনসংখ্যাবিদ এবং নগর বিশেষজ্ঞ অশোক মিত্র ভারতের শহরগুলির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, সাংস্কৃতিক পটভূমি এবং কার্যকারিতার ভিত্তিতে একটি অনন্য শ্রেণীবিভাগ তৈরি করেন। এই মডেলটি ভারতের বিশেষ সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে প্রতিফলিত করে, যা পশ্চিমা মডেল থেকে কিছুটা আলাদা।
গুরুত্ব: অশোক মিত্রের শ্রেণীবিভাগ ভারতের বিশেষ প্রসঙ্গে তৈরি, যা পশ্চিমা মডেল থেকে আলাদা। এটি ভারতীয় শহরগুলির ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশ ও তাদের বহুমুখী কার্যকারিতাকে বুঝতে সাহায্য করে। এই মডেল ভারতের আঞ্চলিক পরিকল্পনা এবং নগর উন্নয়ন নীতির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
১.৪ বসতির গঠন: গ্রামীণ ও শহুরে (Burgess, Hoyt, Harris & Ullman)
শহুরে গঠন মডেল (Urban Morphology Models)
শহরের অভ্যন্তরীণ গঠন বা বিন্যাস সময়ের সাথে সাথে কীভাবে গড়ে ওঠে, তা ব্যাখ্যা করার জন্য সমাজবিজ্ঞানী ও ভূগোলবিদরা বিভিন্ন মডেল তৈরি করেছেন। এই মডেলগুলি শহরের বিভিন্ন এলাকা বা অঞ্চলের মধ্যেকার সম্পর্ক এবং তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যগুলি তুলে ধরে। এদের মধ্যে বার্জেস, হয়ট এবং হ্যারিস ও উলম্যানের মডেলগুলি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
১. বার্জেসের কেন্দ্রমুখী মডেল (Concentric Zone Model) - ১৯২৫
প্রণেতা ও পটভূমি:
এই মডেলটির প্রবক্তা হলেন সমাজবিজ্ঞানী আর্নেস্ট উইলিয়াম বার্জেস (E.W. Burgess)। তিনি ১৯২৫ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত "দ্য সিটি" (The City) নামক গ্রন্থে এই ধারণাটি প্রথম উপস্থাপন করেন। শিল্প বিপ্লবের পর দ্রুত বেড়ে ওঠা শিকাগো শহরের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিন্যাস পর্যবেক্ষণ করে তিনি এই মডেলটি তৈরি করেন। এই মডেলটি ছিল শহরের অভ্যন্তরীণ বিন্যাস সংক্রান্ত প্রথম উল্লেখযোগ্য গবেষণা।
মডেলের কাঠামো ও বর্ণনা:
বার্জেসের মডেল অনুসারে, শহরকে কেন্দ্র করে পাঁচটি সমকেন্দ্রিক বৃত্ত বা বলয় (Concentric Zones) সৃষ্টি হয়, যা শহরের সম্প্রসারণের সময় বাইরের দিকে ধাপে ধাপে বিস্তৃত হয়।
মূল বৈশিষ্ট্য:
কেন্দ্রমুখী বিস্তার: শহরের বৃদ্ধি কেন্দ্র (CBD) থেকে বাইরের দিকে বৃত্তাকারে বা সমকেন্দ্রিক বলয় আকারে ঘটে।
পৃথকীকরণ (Segregation): প্রতিটি বৃত্ত বা বলয় নির্দিষ্ট সামাজিক-অর্থনৈতিক গোষ্ঠী, কাজের ধরন এবং জীবনযাত্রার মান অনুযায়ী স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখে।
ভাড়া-জমির সম্পর্ক: শহরের কেন্দ্র থেকে বাইরের দিকে দূরত্ব বাড়ার সাথে সাথে জমির দাম এবং বাড়িভাড়া ক্রমশ কমতে থাকে। ফলস্বরূপ, উচ্চবিত্তরা কম দামে বড় বাসস্থানের সন্ধানে শহরের বাইরে চলে যায়।
প্রতিযোগিতা: জমি ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলে, যার ফলে 'সর্বোত্তম ব্যবহার' (Highest and Best Use) এর ভিত্তিতে ভূমি ব্যবহার নির্ধারিত হয়।
সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনা:
ভৌগোলিক সরলীকরণ: এই মডেলটি ধরে নেয় যে শহরটি একটি সমতল ও অভিন্ন ভূমির (Isotropic Plain) উপর অবস্থিত। বাস্তবে, পাহাড়, নদী, হ্রদ বা বড় রেলপথের উপস্থিতি শহরের বৃত্তাকার বৃদ্ধিকে ব্যাহত করে।
এককেন্দ্রিক শহরের ধারণা: এটি কেবল একটি কেন্দ্রীয় ব্যবসায়িক জেলার (Single CBD) উপর নির্ভরশীল শহরের জন্য প্রযোজ্য। আধুনিক বহু-কেন্দ্রিক (Poly-centric) শহরের ক্ষেত্রে এই মডেলটি প্রায়োগিক নয়।
পরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা: এই মডেলটি সেই সময়ে উন্নত পরিবহন ব্যবস্থার প্রভাবকে যথাযথভাবে বিবেচনা করেনি। দ্রুতগতির গণপরিবহন এবং ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে মানুষের যাতায়াতের প্রবণতা ও আবাসন নির্বাচনের ধরন পাল্টে গেছে, যা বৃত্তাকার গঠনকে প্রভাবিত করেছে।
সামাজিক সীমাবদ্ধতা: এটি বিভিন্ন জাতি, ধর্ম বা সংস্কৃতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা স্বতন্ত্র এলাকাগুলিকে (যেমন: গেটেড কমিউনিটি) গুরুত্ব দেয়নি।
কালের প্রভাব: এটি একটি স্থির চিত্র তুলে ধরে। সময়ের সাথে সাথে ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন এবং নতুন প্রযুক্তির প্রভাব এতে অন্তর্ভুক্ত নয়।
মডেলের মূল ধারণা (Core Concept):
শহর কেন্দ্র থেকে পাইপের মতো সেক্টর বা খণ্ডে বিস্তার: এই মডেল অনুযায়ী, শহরের ভূমি ব্যবহার কেবল বৃত্তাকার বলয়েই সীমাবদ্ধ নয়, বরং শহরের কেন্দ্র (CBD) থেকে ব্যাসার্ধের মতো নির্দিষ্ট কিছু ভৌগোলিক পথ ধরে বাইরের দিকে প্রসারিত হয়। এই প্রসারিত অংশগুলোকেই 'সেক্টর' বা 'খণ্ড' বলা হয়।
প্রতিটি সেক্টর নির্দিষ্ট সামাজিক গোষ্ঠী বা কার্যক্রমের জন্য: প্রতিটি সেক্টর একটি নির্দিষ্ট ধরনের অর্থনৈতিক কার্যক্রম (যেমন শিল্প) বা একটি নির্দিষ্ট সামাজিক গোষ্ঠীর (যেমন উচ্চবিত্ত বা শ্রমিক শ্রেণী) দ্বারা প্রভাবিত থাকে। উদাহরণস্বরূপ, একটি সেক্টর উচ্চবিত্তের বাসস্থান, অন্যটি মধ্যবিত্তের, এবং তৃতীয়টি শিল্প ও শ্রমিকের বাসস্থান হতে পারে।
উচ্চভাড়ার অঞ্চলগুলো সুবিধাজনক দিকে বিস্তৃত: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, উচ্চবিত্ত বা উচ্চভাড়ার আবাসন অঞ্চলগুলো সবসময় শহরের সবচেয়ে অনুকূল দিক বরাবর প্রসারিত হয়। এই অনুকূল দিকগুলো সাধারণত বায়ুপ্রবাহের ভালো সুবিধা, আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক দৃশ্য, অথবা দ্রুত পরিবহন ব্যবস্থার কাছাকাছি অবস্থান ইত্যাদি দ্বারা নির্ধারিত হয়। এই অঞ্চলগুলো শহরের কেন্দ্র থেকে বাইরের দিকে ব্যাসার্ধের মতো রেললাইন, প্রধান সড়ক বা জলপথ বরাবর প্রসারিত হয়।
সেক্টর বিন্যাস (Sector Arrangement): হোয়েট এই বিন্যাসটি চিত্রে দেখিয়েছেন (যদিও এটি কেবল একটি সরলীকৃত চিত্র):
N
↑
[উচ্চবিত্ত] | [উচ্চবিত্ত]
\ | /
\ | /
[মধ্যবিত্ত]\ \ | /[মধ্যবিত্ত]
\ | /
\ | /
[শ্রমিক]----CBD----[শ্রমিক]
/ | \
/ | \
[শিল্প] / | \ [শিল্প]
|
S
CBD (Central Business District): শহরের একেবারে কেন্দ্রে অবস্থিত, যা সর্বোচ্চ প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করে এবং বাণিজ্যিক কার্যকলাপের প্রাণকেন্দ্র।
শ্রমিক শ্রেণী/নিম্নবিত্তের আবাসন: সাধারণত রেললাইন বা প্রধান শিল্পাঞ্চলের কাছাকাছি অবস্থিত। পরিবহন ব্যয় হ্রাস এবং কাজের কাছাকাছি থাকার কারণে এই স্থানগুলো তাদের জন্য সুবিধাজনক।
শিল্প এলাকা: রেলপথ, নদী বা অন্যান্য প্রধান পরিবহন রুটের ধারে গড়ে ওঠে, যা কাঁচামাল আমদানি ও উৎপাদিত পণ্য বিতরণে সুবিধা দেয়।
মধ্যবিত্তের আবাসন: এই অঞ্চলগুলো উচ্চবিত্ত এবং নিম্নবিত্তের অঞ্চলের মাঝখানে একটি ট্রানজিশনাল বা পরিবর্তনশীল এলাকা হিসেবে কাজ করে।
উচ্চবিত্তের আবাসন: শহরের সবচেয়ে সুবিধাজনক দিকে এবং শহরের প্রান্তের দিকে প্রসারিত হয়, যেখানে বায়ুর গুণমান ভালো এবং জনবসতি কম ঘন।
মডেলের বৈশিষ্ট্য ও প্রযোজ্যতা (Characteristics and Applicability):
পরিবহন ব্যবস্থার প্রভাব: এই মডেল রেলপথ, প্রধান সড়ক এবং ট্রাম লাইনের মতো পরিবহন পথ শহরের বৃদ্ধির ধরন নির্ধারণে যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তা স্পষ্ট করে তুলে ধরে। শিল্প এলাকাগুলি প্রায়শই এই পরিবহন পথের ধারে কেন্দ্রীভূত হয়।
আবাসন মূল্যের গতিশীলতা: হয়েট দেখিয়েছেন যে আবাসন মূল্য সাধারণত সবচেয়ে ব্যয়বহুল সেক্টর বরাবর বাইরের দিকে স্থানান্তরিত হয়। একবার একটি উচ্চভাড়ার সেক্টর স্থাপিত হলে, তা ওই দিক বরাবরই প্রসারিত হওয়ার প্রবণতা দেখায়, কারণ পুরোনো বাড়িগুলোকে নতুন ও আরও দামি বাড়িগুলোর জন্য পথ তৈরি করতে হয়।
শ্রেণী বিভাজন: এটি স্পষ্ট করে যে শহরের সামাজিক শ্রেণীগুলো বৃত্তাকার বলয়ের পরিবর্তে নির্দিষ্ট খণ্ড বা সেক্টরে পৃথকভাবে অবস্থান করে।
শ্রেষ্ঠ প্রযোজ্যতা: যে সমস্ত শহর রেলপথ বা নদীর মতো প্রধান পরিবহন বা প্রাকৃতিক রুটের ধারে প্রসারিত হয়েছে, সেই শহরগুলোর ভূমি ব্যবহার বিন্যাস ব্যাখ্যা করার জন্য হয়েটের মডেল বিশেষভাবে কার্যকর।
৩. হ্যারিস ও উলম্যানের বহুকেন্দ্রিক মডেল (Multiple Nuclei Model) - ১৯৪৫
এই মডেলটি চাউন্সি হ্যারিস (Chauncy Harris) এবং এডওয়ার্ড উলম্যান (Edward Ullman) ১৯৪৫ সালে উপস্থাপন করেন। তারা শিকাগো সহ অন্যান্য বড় শহরের জটিল ভূমি ব্যবহারের বিন্যাস বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন। এটি পূর্ববর্তী এককেন্দ্রিক (বার্জেস) এবং দ্বিকেন্দ্রিক (হয়েট) মডেলের একটি বড় পরিবর্তন, যা আধুনিক, বড় শহরের বহু-কার্যক্রমের জটিলতাকে প্রতিফলিত করে।
মডেলের মূল ধারণা (Core Concept):
শহর একক কেন্দ্র নয়, বহু কেন্দ্র নিয়ে গঠিত: এই মডেলের মূল প্রতিপাদ্য হলো যে আধুনিক বড় শহরগুলো কেবল একটি কেন্দ্রীয় ব্যবসায়িক কেন্দ্র (CBD) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না, বরং একাধিক বিশেষায়িত কেন্দ্র বা 'নিউক্লিআই' (nuclei) দ্বারা গঠিত। এই কেন্দ্রগুলো শহরের ইতিহাসের মাধ্যমে বা সচেতন পরিকল্পনা দ্বারা তৈরি হতে পারে।
বিভিন্ন কার্যক্রম নিজেদের পছন্দসই স্থানে গড়ে ওঠে: এই বিভিন্ন কেন্দ্রগুলো তাদের কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তা, লাভজনকতা এবং একে অপরের সাথে সামঞ্জস্যের ভিত্তিতে স্ব-উদ্যোগে বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ, শিল্পাঞ্চলগুলি পরিবহন সুবিধার জন্য, এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলি পর্যাপ্ত স্থান ও শান্ত পরিবেশের জন্য আলাদা কেন্দ্রে গড়ে উঠতে পারে।
বহুকেন্দ্রিকতার কারণ (Reasons for Multiple Nuclei): বিভিন্ন ধরনের কার্যকলাপ বা নিউক্লিয়াই গড়ে ওঠার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ কাজ করে:
কিছু কার্যক্রমের বিশেষায়িত প্রয়োজন: কিছু কার্যকলাপের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধার প্রয়োজন হয় যা শহরের অন্য কোথাও পাওয়া যায় না (যেমন, বন্দরের জন্য জলপথ, বিমানবন্দরের জন্য বড় সমতল ভূমি)।
পারস্পরিক সুবিধা (Grouping Tendency): কিছু কার্যকলাপ একে অপরের কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে কারণ তারা একে অপরের থেকে উপকৃত হয় (যেমন, খুচরা বিক্রেতারা CBD-তে ভিড় করে, কারণ কাছাকাছি থাকলে গ্রাহক সংখ্যা বাড়ে)।
পারস্পরিক অসঙ্গতি (Repulsion Tendency): কিছু কার্যকলাপ একে অপরের সাথে বেমানান বা সাংঘর্ষিক হয় এবং তাই তারা একে অপরের থেকে দূরে সরে যায় (যেমন, উচ্চবিত্তের আবাসন এবং শিল্পাঞ্চল)।
ভূমি ব্যবহারের খরচ: শহরের কেন্দ্রে জমির মূল্য অনেক বেশি হওয়ায় অনেক কার্যকলাপ, যাদের কেন্দ্রীয় অবস্থানের প্রয়োজন নেই, তারা খরচ বাঁচাতে পেরিফেরিয়াল বা প্রান্তীয় এলাকায় স্থানান্তরিত হয়।
গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলো (Key Nuclei):
এই মডেলে বেশ কয়েকটি সাধারণ কেন্দ্র বা নিউক্লিয়াই চিহ্নিত করা হয়, যদিও একটি নির্দিষ্ট শহরে এগুলোর উপস্থিতি ও গুরুত্ব ভিন্ন হতে পারে:
মডেলের সুবিধা ও গুরুত্ব (Advantages and Significance):
বাস্তব শহরের ব্যাখ্যা: এই মডেলটি বিশেষভাবে বড় এবং আধুনিক শহরের জটিল ভূমি ব্যবহার বিন্যাসকে আরও বাস্তবসম্মতভাবে ব্যাখ্যা করে, যা বার্জেস বা হয়েটের সরলীকৃত মডেলগুলি পারতো না।
বিভিন্ন কার্যক্রমের বিশেষায়িত অবস্থান ব্যাখ্যা: এটি ব্যাখ্যা করে যে কেন বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কার্যক্রম তাদের নির্দিষ্ট চাহিদা মেটানোর জন্য শহরের বিভিন্ন অংশে বিশেষায়িত কেন্দ্রে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে।
আধুনিক শহরের জটিলতা বিবেচনায় নেয়: বিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে শহরের বিকেন্দ্রীকরণ ও উপশহরগুলির বৃদ্ধির সাথে সাথে যে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছিল, এই মডেলটি তা ভালোভাবে বিবেচনা করে।
-----তুলনামূলক সারণি (Comparative Table) - নগর ভূমি ব্যবহার মডেলসমূহ
১.৫ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারণা (5 নম্বর)
শহুরে ভূগোল এবং বসতি বিন্যাসের ক্ষেত্রে বেশ কিছু মৌলিক ধারণা রয়েছে যা নগরগুলির কার্যপ্রণালী, কাঠামো এবং বিশ্বব্যাপী তাদের গুরুত্ব বুঝতে সাহায্য করে। নিচে সেই ধারণাগুলির একটি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:-
১. প্রাথমিক নগর (Primate City)
সংজ্ঞা: প্রাথমিক নগর হলো একটি দেশের সেই বৃহত্তম শহর যা দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরটির তুলনায় জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক ক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্বের দিক থেকে অনেক বেশি বড় এবং প্রভাবশালী। এটি দেশের সামগ্রিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে।
প্রতিষ্ঠাতা/ধারণা: মার্ক জেফারসন (Mark Jefferson) ১৯৩৯ সালে এই ধারণাটি প্রথম দেন।
বৈশিষ্ট্য:
জনসংখ্যার আধিক্য: প্রাথমিক নগরের জনসংখ্যা সাধারণত দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরের জনসংখ্যার দ্বিগুণ বা তারও বেশি হয় (এই অনুপাতকে 'প্রাথমিকতা অনুপাত' বা 'Primacy Ratio' বলা হয়)।
সুবিধা ও সুযোগ-সুবিধার কেন্দ্রীভবন: দেশের প্রায় সমস্ত প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, প্রশাসনিক সদর দপ্তর এবং সাংস্কৃতিক অবকাঠামো এই শহরে কেন্দ্রীভূত থাকে।
আন্তর্জাতিক সংযোগ: এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, কূটনীতি এবং যোগাযোগের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। দেশের প্রধান বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দর প্রায়শই এখানেই অবস্থিত হয়।
আঞ্চলিক বৈষম্য সৃষ্টি: এই নগরের অত্যধিক বৃদ্ধি দেশের অন্যান্য ছোট এবং মাঝারি আকারের শহরগুলোর উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করে এবং গ্রামীণ-শহুরে বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
উদাহরণ:
ভারতের ক্ষেত্রে: ভারতে প্রাথমিক নগর অনুপস্থিত। এর কারণ হলো মুম্বই, দিল্লি, কলকাতা, চেন্নাই এবং বেঙ্গালুরুর মতো শহরগুলো জনসংখ্যা এবং অর্থনৈতিক গুরুত্বের দিক থেকে একে অপরের কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। কোনো একক শহর দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরের তুলনায় এতটা প্রভাবশালী নয়।
২. র্যাঙ্ক-সাইজ নিয়ম (Rank-Size Rule)
সংজ্ঞা: র্যাঙ্ক-সাইজ নিয়ম হলো একটি দেশের বসতি কাঠামোর পরিসংখ্যানগত নিয়ম যা কোনো একটি শহরের ক্রম (Rank) এবং তার জনসংখ্যার আকার (Size) এর মধ্যে একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। এই নিয়মটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ এবং সুসংগঠিত বসতি কাঠামোর প্রতি ইঙ্গিত করে।
প্রতিষ্ঠাতা: জর্জ জিপফ (George Zipf), ১৯৪৯ সালে এই নিয়মটি প্রতিষ্ঠা করেন।
ব্যাখ্যা:
দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরের জনসংখ্যা: এই নিয়ম অনুসারে, দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরের জনসংখ্যা হবে বৃহত্তম শহরের জনসংখ্যার ঠিক অর্ধেক।
তৃতীয় বৃহত্তম শহরের জনসংখ্যা: এটি প্রথম শহরের জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ হবে।
চতুর্থ বৃহত্তম শহরের জনসংখ্যা: এটি প্রথম শহরের জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ হবে।
এই নিয়মটি একটি দেশের বা অঞ্চলের সমস্ত আকারের বসতির মধ্যে সম্পদ এবং সুযোগের অপেক্ষাকৃত সমবন্টন নির্দেশ করে।
উদাহরণ (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র):
ব্যতিক্রম:
প্রাথমিক নগরযুক্ত দেশ: যেসব দেশে একটি শক্তিশালী প্রাথমিক নগর থাকে (যেমন ফ্রান্স, থাইল্যান্ড), সেখানে এই নিয়মটি কার্যকর হয় না। প্রাথমিক নগরটি প্রত্যাশিত আকারের চেয়ে অনেক বড় হয়।
ফেডারেল বা অত্যন্ত পরিকল্পিত দেশ: কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো ফেডারেল কাঠামোর দেশগুলোতে একাধিক আঞ্চলিক কেন্দ্র থাকায় এই নিয়মটি সব সময় প্রযোজ্য হয় না।
৩. মহানগরী (Metropolis) ও মেগালোপলিস (Megalopolis)মহানগরী (Metropolis)
সংজ্ঞা: মহানগরী হলো একটি অতি বৃহৎ, জনবহুল শহর যা তার আশেপাশের অপেক্ষাকৃত ছোট শহর ও গ্রামীণ অঞ্চলের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে। গ্রিক শব্দ 'Metro' (মা) এবং 'Polis' (শহর) থেকে এর উৎপত্তি।
বৈশিষ্ট্য:
জনসংখ্যা: সাধারণত ১০ লক্ষ বা ১ মিলিয়নের বেশি জনসংখ্যা থাকে।
কার্যকারিতা: এটি তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের জন্য বিভিন্ন স্তরের পরিষেবা, কর্মসংস্থান এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ সরবরাহ করে।
পরিকাঠামো: উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা, উচ্চ মানের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং আধুনিক নাগরিক পরিষেবা বিদ্যমান থাকে।
উদাহরণ: কলকাতা, দিল্লি, মুম্বই, চেন্নাই (ভারত), ব্যাংকক (থাইল্যান্ড), সিঙ্গাপুর, নিউ ইয়র্ক (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)।
মেগালোপলিস (Megalopolis)
সংজ্ঞা: মেগালোপলিস হলো একাধিক কাছাকাছি অবস্থিত মহানগরী ও কনার্বেশন অঞ্চলের সংযোগে গঠিত একটি অতিবৃহৎ এবং প্রায় অবিচ্ছিন্ন নগরায়ন অঞ্চল। এর মাধ্যমে একটি বিশাল আঞ্চলিক নগর ব্যবস্থা তৈরি হয়।
প্রতিষ্ঠাতা: জিন গটম্যান (Jean Gottmann), ১৯৬১ সালে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ "Megalopolis: The Urbanized Northeastern Seaboard of the United States" এ এই ধারণাটি দেন।
বৈশিষ্ট্য:
একাধিক কেন্দ্র: এই অঞ্চলে একাধিক প্রধান মহানগরী থাকে, যা তাদের মধ্যেকার ছোট শহর ও শহরতলির মাধ্যমে সংযুক্ত হয়।
অবিচ্ছিন্ন বসতি: বসতি এলাকাগুলি এত কাছাকাছি চলে আসে যে, তাদের মধ্যেকার গ্রামীণ স্থানগুলি প্রায় বিলীন হয়ে যায়।
আঞ্চলিক প্রভাব: এটি শুধু একটি দেশ নয়, বরং আন্তর্জাতিকভাবেও বিশাল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে।
বৃহৎ অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত: প্রায়শই এটি আন্তঃরাজ্য বা একাধিক প্রশাসনিক অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত হয়।
বিশ্বের প্রধান মেগালোপলিস:
৪. কনার্বেশন (Conurbation)
সংজ্ঞা: কনার্বেশন হলো একাধিক পৃথক শহর বা নগরাঞ্চলের সংযোগে গঠিত একটি বৃহৎ নগর এলাকা। সময়ের সাথে সাথে যখন পার্শ্ববর্তী শহরগুলি বৃদ্ধি পেয়ে একে অপরের সাথে মিশে যায়, কিন্তু তাদের নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য (পৃথক প্রশাসনিক কেন্দ্র বা নাম) বজায় থাকে, তখন এই ধরনের বসতি কাঠামো তৈরি হয়।
প্রতিষ্ঠাতা: প্যাট্রিক গেডিস (Patrick Geddes), একজন স্কটিশ পরিবেশবিদ ও নগর পরিকল্পনাবিদ, ১৯১৫ সালে তাঁর "Cities in Evolution" গ্রন্থে এই শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন।
বৈশিষ্ট্য:
মিশে যাওয়া শহর: এটি একাধিক শহরের দৈহিক সংযুক্তিকে বোঝায়, যেখানে মূল শহর এবং তার পাশের শহরগুলির মধ্যেকার পার্থক্য 'ফিকে' হয়ে যায়।
পৃথক কেন্দ্র: মেগালোপলিসের মতো বৃহৎ আন্তঃআঞ্চলিক কেন্দ্র না হয়ে, কনার্বেশনের অন্তর্গত শহরগুলির নিজস্ব পৃথক কেন্দ্র এবং কার্যকারিতা থাকতে পারে, কিন্তু তারা সামগ্রিকভাবে একটি একক বৃহৎ এলাকা হিসেবে কাজ করে।
আঞ্চলিক সংযোগ: পরিবহন এবং অর্থনৈতিক কার্যকলাপের কারণে এই শহরগুলি নিবিড়ভাবে সংযুক্ত থাকে।
উদাহরণ: সাধারণত নদী বা উপকূলবর্তী সমতল ভূমিতে বা শিল্পাঞ্চলে এই ধরনের গঠন বেশি দেখা যায়।
উদাহরণ:
মেগালোপিস vs কনার্বেশন:
৫. উপগ্রহ শহর (Satellite Town)
সংজ্ঞা: উপগ্রহ শহর হলো মূল শহর বা মহানগরীর আশেপাশের অঞ্চলে পরিকল্পনামাফিক গড়ে তোলা ছোট শহর। এই শহরগুলি মূল শহরের আবাসন এবং শিল্প সংক্রান্ত চাপ কমাতে সাহায্য করে।
বৈশিষ্ট্য:
পরিকল্পনামাফিক সৃষ্টি: এগুলি অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠে না, বরং নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তৈরি হয়।
স্বতন্ত্রতা ও নির্ভরশীলতা: উপগ্রহ শহরগুলি তাদের নিজস্ব পরিকাঠামো, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এবং নাগরিক পরিষেবা (স্কুল, হাসপাতাল, বাজার) বজায় রাখে। তাই এগুলি মূল শহরের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল নয়, বরং আংশিক নির্ভরশীলতা থাকে।
কাজ: প্রধানত আবাসন, ছোট শিল্প এবং পরিষেবা খাতের বিকাশের উপর জোর দেওয়া হয়।
পরিবহন সংযোগ: মূল শহরের সাথে এদের দ্রুত এবং দক্ষ পরিবহন (যেমন মেট্রো, দ্রুত গতির সড়কপথ) সংযোগ থাকে, যাতে যাতায়াত সহজ হয়।
ভারতের উদাহরণ:
৬. স্মার্ট সিটি (Smart City)
সংজ্ঞা: স্মার্ট সিটি হলো এমন একটি শহর যেখানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (Information and Communication Technology - ICT) এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে শহরের মৌলিক পরিষেবা ও পরিকাঠামোগুলিকে উন্নত করা হয়। এর মূল লক্ষ্য হলো নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা, শহরের পরিবেশকে আরও টেকসই করা এবং সম্পদের ব্যবহারকে আরও দক্ষ করে তোলা।
মূল উপাদান এবং প্রযুক্তিগত সমাধান:
ভারতের স্মার্ট সিটি মিশন (২০১৫):
ভারত সরকার ২০১৫ সালে 'স্মার্ট সিটি মিশন' চালু করে, যার লক্ষ্য ছিল দেশের ১০০টি শহরকে স্মার্ট সিটি হিসেবে গড়ে তোলা।
এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল 'স্মার্ট সমাধান' (Smart Solutions) এবং 'ক্ষেত্রভিত্তিক উন্নয়ন' (Area Based Development) এর মাধ্যমে শহরের মূল সমস্যাগুলির সমাধান করা।
শহরগুলির মধ্যে রয়েছে: কলকাতা, দিল্লি, মুম্বই, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ সহ অন্যান্য রাজ্য রাজধানী এবং অর্থনৈতিক কেন্দ্র।
৭. পুরা (PURA) - Providing Urban Amenities in Rural Areas
সংজ্ঞা: পুরা (PURA) হলো একটি কৌশলগত মডেল যার উদ্দেশ্য হলো গ্রামীণ অঞ্চলে শহুরে সুযোগ-সুবিধাগুলি পৌঁছে দেওয়া, যাতে গ্রামীণ অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত হয় এবং গ্রামীণ-শহুরে বৈষম্য হ্রাস পায়।
ধারণা প্রদানকারী: ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ড. এ.পি.জে. আবদুল কালাম, ২০০৩ সালে তাঁর "Vision 2020" ধারণার অংশ হিসেবে এই প্রকল্পটি প্রস্তাব করেন।
লক্ষ্য:
গ্রামে শহরের উন্নত অবকাঠামো ও পরিষেবা স্থাপন করা।
গ্রামীণ-শহুরে পলায়ন (Migration) হ্রাস করা।
গ্রামীণ অর্থনীতিকে কৃষি-নির্ভরতা থেকে বহুমুখী শিল্প ও পরিষেবা-নির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করা।
চারটি সংযোগ (4 Connectivity) - পুরা প্রকল্পের ভিত্তি:
১. ভৌত সংযোগ (Physical Connectivity): উন্নত রাস্তা, পরিবহন ব্যবস্থা, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ, পানীয় জল এবং ইন্টারনেট অবকাঠামো।
২. ইলেকট্রনিক সংযোগ (Electronic Connectivity): টেলিযোগাযোগ, ই-গভর্নেন্স পরিষেবা, ইন্টারনেট অ্যাক্সেস।
৩. জ্ঞানের সংযোগ (Knowledge Connectivity): শিক্ষা, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, তথ্য কেন্দ্র এবং কারিগরি সহায়তা।
৪. অর্থনৈতিক সংযোগ (Economic Connectivity): স্থানীয় উৎপাদন ও পরিষেবার জন্য বাজার, ব্যাংকিং ও ঋণ সুবিধা, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি।
বৈশিষ্ট্য:
পুরা ক্লাস্টার: একাধিক কাছাকাছি অবস্থিত গ্রামকে একত্রিত করে একটি 'পুরা ক্লাস্টার' তৈরি করা হয়, যা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনৈতিক একক হিসেবে কাজ করে।
PPP মডেল: প্রকল্পটি প্রায়শই পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) মডেলে বাস্তবায়িত হয়।
সমন্বয়: কৃষি, শিল্প এবং পরিষেবার সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ গ্রামীণ অর্থনীতি তৈরি করা।
উদাহরণ: তামিলনাড়ুর মানিগ্রাম পুরা প্রকল্পটি একটি সফল মডেল হিসেবে পরিচিত।
১.৬ ভারতে গ্রামীণ ও শহুরে বসতির সমস্যা (5 নম্বর)
ভারতের বসতিগুলিতে বিশেষত দ্রুত নগরায়ণ এবং পরিকল্পনার অভাবে বহুবিধ সমস্যা বিদ্যমান। এই সমস্যাগুলি গ্রামীণ এবং শহুরে উভয় ক্ষেত্রেই ভিন্ন ভিন্ন রূপে পরিলক্ষিত হয়।
গ্রামীণ বসতির সমস্যা
ভারতের গ্রামীণ এলাকা এখনও বহু মৌলিক সমস্যায় জর্জরিত, যার মূল কারণগুলির মধ্যে অন্যতম হলো কৃষি-নির্ভরতা এবং অবকাঠামোর অভাব।
শহুরে বসতির সমস্যা
অপরিকল্পিত ও দ্রুত নগরায়ণের ফলে ভারতের শহরগুলি অত্যাধিক চাপ এবং জনজট নিয়ে চলছে, যা নাগরিক জীবনের গুণগত মানকে হ্রাস করছে।
সমাধানমূলক পদক্ষেপ
ভারত সরকার গ্রামীণ ও শহুরে বসতির সমস্যা মোকাবিলায় একাধিক প্রকল্প ও উদ্যোগ গ্রহণ করেছে:গ্রামীণ এলাকায়:
মনরেগা (MGNREGA - Mahatma Gandhi National Rural Employment Guarantee Act): গ্রামীণ পরিবারগুলিকে ১০০ দিনের নিশ্চিত কর্মসংস্থান প্রদানের মাধ্যমে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব হ্রাস করা।
প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনা (PMGSY): গ্রামীণ এলাকায় উন্নত সড়ক সংযোগ স্থাপন করে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটানো।
স্বচ্ছ ভারত অভিযান (SBM - Gramin): গ্রামে শৌচাগার নির্মাণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি উন্নত করা।
দীনদয়াল উপাধ্যায় গ্রাম জ্যোতি যোজনা (DDUGJY): গ্রামীণ এলাকায় সার্বজনীন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা।
পুরা প্রকল্প (PURA): গ্রামে শহরের সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা।
জল জীবন মিশন (JJM): ২০২৪ সালের মধ্যে প্রতিটি গ্রামীণ বাড়িতে নলবাহিত জলের সংযোগ প্রদান।
শহুরে এলাকায়:
জওহরলাল নেহেরু ন্যাশনাল আরবান রিনিউয়াল মিশন (JNNURM): বড় শহরগুলিতে অবকাঠামো উন্নয়ন, আবাসন এবং মৌলিক পরিষেবা প্রদানের লক্ষ্যে চালু হওয়া পুরনো একটি বৃহৎ প্রকল্প।
স্মার্ট সিটি মিশন (SCM): আইসিটি ব্যবহার করে শহরের পরিকাঠামো ও পরিষেবা উন্নত করে ১০০টি শহরকে স্মার্ট সিটি হিসেবে গড়ে তোলা।
অটল মিশন ফর রিজুভেনেশন অ্যান্ড আরবান ট্রান্সফরমেশন (AMRUT): জল সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাশন, ঝড়-জলের নিষ্কাশন এবং সবুজ স্থান বৃদ্ধির মতো মৌলিক নাগরিক পরিষেবা উন্নত করা।
প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা (PMAY - Urban): ২০২৫ সালের মধ্যে শহুরে অঞ্চলের প্রত্যেকের জন্য আবাসন (Housing for All) নিশ্চিত করা।
মেট্রো রেল ও দ্রুত গণপরিবহন প্রকল্প: যানজট কমানো এবং পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
স্বচ্ছ ভারত অভিযান (SBM - Urban): কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ এবং শহরগুলিকে উন্মুক্ত মলত্যাগ মুক্ত করা।
সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য)
প্রশ্ন ১: প্রাথমিক নগর ও র্যাঙ্ক-সাইজ নিয়মের মধ্যে পার্থক্য লেখ।
উত্তর: প্রাথমিক নগর হলো একটি দেশের সবচেয়ে বড় শহর যা দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরের চেয়ে জনসংখ্যা ও গুরুত্বে অনেক বড় (যেমন ফ্রান্সের প্যারিস)। এটি এককেন্দ্রিক উন্নয়ন নির্দেশ করে। অন্যদিকে, র্যাঙ্ক-সাইজ নিয়ম হলো একটি পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক যা বলে দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরের জনসংখ্যা প্রথমটির অর্ধেক হবে (যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)। এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ বসতি কাঠামোর ইঙ্গিত দেয়। প্রাথমিক নগর বিদ্যমান থাকলে র্যাঙ্ক-সাইজ নিয়ম কার্যকর হয় না।
প্রশ্ন ২: মেগালোপলিস ও কনার্বেশনের পার্থক্য কী?
উত্তর: মেগালোপলিস হলো একাধিক মহানগরীর সংযোগে গঠিত একটি অতিবৃহৎ অঞ্চল যা বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত (যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বোসওয়াশ)। এটি সাধারণত আন্তঃআঞ্চলিক বা আন্তঃরাজ্য হয়। পক্ষান্তরে, কনার্বেশন হলো একাধিক শহরের দৈহিক সংযোগে গঠিত একটি বৃহৎ নগর এলাকা, যেখানে পৃথক শহরগুলির স্বাতন্ত্র্য ফিকে হয়ে যায় কিন্তু নিজস্ব কেন্দ্র বজায় থাকে (যেমন কলকাতা কনার্বেশন)। কনার্বেশন মেগালোপলিসের চেয়ে অপেক্ষাকৃত ছোট।
প্রশ্ন ৩: বার্জেস ও হয়েটের মডেলের পার্থক্য লেখ।
উত্তর: আরনেস্ট বার্জেস (Ernest Burgess) ১৯২৫ সালে তাঁর সমকেন্দ্রিক বলয় মডেল (Concentric Zone Model) এ বলেন যে শহর কেন্দ্র থেকে বৃত্তাকারে বা বলয়াকারে বিস্তৃত হয়। প্রতিটি বলয় একটি নির্দিষ্ট কার্যকারিতার প্রতিনিধিত্ব করে। অন্যদিকে, হোমার হয়েট (Homer Hoyt) ১৯৩৯ সালে তাঁর সেক্টর মডেল (Sector Model) এ বলেন যে শহর সেক্টর বা খণ্ডে বিস্তৃত হয়। এই সেক্টরগুলি সাধারণত পরিবহন পথ (যেমন রেললাইন বা প্রধান সড়ক) বরাবর কেন্দ্রের দিকে প্রসারিত হয় এবং ভূমি ব্যবহারের ধরন এই সেক্টরগুলির উপর ভিত্তি করে বিকশিত হয়।
জনবসতি ভূগোল (Settlement Geography) সম্পর্কিত ২০টি ২ নম্বরের প্রশ্ন ও উত্তর নিচে দেওয়া হলো:
১. প্রশ্ন: জনবসতি ভূগোল বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: জনবসতি ভূগোল হলো মানব জমি, জল এবং সম্পদের ব্যবহার, জনসংখ্যার ঘনত্বের বিন্যাস, এবং জনবসতির বৃদ্ধির অধ্যয়ন। এটি নগর পরিকল্পনা এবং নগর ভূদৃশ্যের জন্য অপরিহার্য। জনবসতি ভূগোল গ্রাম, শহর ইত্যাদি এবং তাদের মধ্যে সৃষ্ট সম্পর্কের ধরণগুলিও অধ্যয়ন করে।
২. প্রশ্ন: 'জনবসতি' বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: একটি জনবসতি হলো আশ্রয়ের জন্য স্থান, যেখানে মানুষ বসবাস করে। এটি মানুষের তার পরিবেশের সাথে অভিযোজনের প্রথম পদক্ষেপ। এটি মানুষের একটি সংগঠিত উপনিবেশকে বোঝায়, যেখানে তাদের বাসস্থান এবং অন্যান্য ভবন (দোকান, হোটেল, ব্যাংক ইত্যাদি), ভ্রমণ করার জন্য রাস্তা, এবং পথ থাকে।
৩. প্রশ্ন: জনবসতি (Settlement) কত প্রকারের হতে পারে?
উত্তর: জনবসতি আকারে খুব ছোট থেকে অত্যন্ত বড় হতে পারে। এটি একটি ঘর থেকে শুরু করে কোটি কোটি মানুষের বাসস্থান মেগাসিটি পর্যন্ত বড় হতে পারে। জনবসতি স্থায়ী বা অস্থায়ী হতে পারে।
৪. প্রশ্ন: জনবসতি ভূগোলের মূল লক্ষ্য কী?
উত্তর: জনবসতি ভূগোল অধ্যয়নের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো বিভিন্ন পরিবেশগত পরিস্থিতিতে মানব জনবসতির স্থানিক ও কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যগুলির সঙ্গে পরিচিত হওয়া। এর মধ্যে রয়েছে জনবসতির স্থান ও কাঠামো - অভ্যন্তরীণ রূপবিদ্যা এবং বাহ্যিক আকার, ক্ষেত্রের ধরণ, কার্যাবলী এবং ঘর-বাড়ির ধরণ।
৫. প্রশ্ন: জর্ডান (Jordan, 1966) জনবসতি ভূগোলের সংজ্ঞা কীভাবে দিয়েছেন?
উত্তর: জর্ডান (Jordan, 1966) জোর দিয়েছিলেন যে জনবসতি ভূগোল শুধুমাত্র বন্টনই সম্পূর্ণরূপে অনুসন্ধান করে না, বরং বসতি এবং এর পরিবেশের (যেমন মাটি, ভূমিরূপ, অর্থনীতি বা সমাজ) মধ্যেকার কাঠামো, প্রক্রিয়া এবং মিথস্ক্রিয়াগুলিও অনুসন্ধান করে, যা বসতি তৈরি করে।
৬. প্রশ্ন: জনবসতির 'স্থান' (Site) বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: জনবসতির 'স্থান' (Site) দ্বারা সেই প্রকৃত জমিকে বর্ণনা করা হয় যার উপর জনবসতিটি নির্মিত হয়। এটি হলো সেই শারীরিক ভূমি যার উপর জনবসতিটি তৈরি হয়েছিল।
৭. প্রশ্ন: জনবসতির 'অবস্থান' (Situation) বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: জনবসতির 'অবস্থান' (Situation) বর্ণনা করে যে, অন্যান্য পার্শ্ববর্তী বৈশিষ্ট্য যেমন অন্যান্য জনবসতি, নদী এবং যোগাযোগের সাপেক্ষে একটি জনবসতি কোথায় অবস্থিত। এটি এর পারিপার্শ্বিকতার সাথে সম্পর্কিত জনবসতিকে বোঝায়।
৮. প্রশ্ন: জনবসতির 'কার্যকারিতা' (Function) কীসের সঙ্গে সম্পর্কিত?
উত্তর: জনবসতির 'কার্যকারিতা' (Function) এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের সাথে সম্পর্কিত এবং এর প্রধান কার্যকলাপগুলিকে বোঝায়।
৯. প্রশ্ন: গ্রামীণ জনবসতি বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: যে কোনো জনবসতি যেখানে বেশিরভাগ মানুষ কৃষি, বনজ, খনি এবং মৎস্য চাষের মতো প্রাথমিক ক্রিয়াকলাপের সাথে জড়িত থাকে, তাকে গ্রামীণ জনবসতি (Rural settlement) বলা হয়। এটিকে প্রায়শই 'কৃষি কর্মশালা'ও বলা হয়।
১০. প্রশ্ন: গ্রামীণ জনবসতির ধরন নির্ধারণের প্রধান কারণগুলি কী কী?
উত্তর: গ্রামীণ জনবসতির ধরনগুলি মূলত নির্মিত এলাকার বিস্তার এবং ঘরের মধ্যবর্তী দূরত্বের দ্বারা নির্ধারিত হয়। ভারতে বিভিন্ন ধরণের গ্রামীণ জনবসতি থাকার জন্য বিভিন্ন কারণ এবং পরিস্থিতি দায়ী।
১১. প্রশ্ন: ভারতে গ্রামীণ জনবসতির প্রধান প্রকারভেদগুলি কী কী?
উত্তর: ভারতে গ্রামীণ জনবসতিগুলিকে প্রধানত চারটি প্রকারে ভাগ করা যেতে পারে: ১) সংহত জনবসতি (Compact settlements), ২) প্রায়-সংহত জনবসতি (Semi-compact settlements), ৩) হ্যামলেটেড জনবসতি (Hamlated settlements), এবং ৪) বিচ্ছিন্ন জনবসতি (Dispersed settlements)।
১২. প্রশ্ন: সংহত জনবসতি (Clustered Settlement) কাকে বলে?
উত্তর: যে জনবসতিতে ঘরগুলি একে অপরের কাছাকাছি এবং ঘন সন্নিবিষ্টভাবে তৈরি করা হয়, তাকে সংহত জনবসতি বলা হয়। এই ধরণের জনবসতির আকার সাধারণত আয়তক্ষেত্রাকার, ব্যাসার্ধযুক্ত বা রৈখিক হয়ে থাকে।
১৩. প্রশ্ন: প্রায়-সংহত জনবসতি (Semi-Clustered Settlement) কেমন দেখতে হয়?
উত্তর: বিক্ষিপ্ত জনবসতির একটি সীমাবদ্ধ এলাকায় জনবসতির ক্লাস্টারিং হলে সেটিকে প্রায়-সংহত জনবসতি বলে মনে হয়। এই ধরণের জনবসতি গুজরাট সমভূমি এবং রাজস্থানের কিছু অংশে দেখা যায়।
১৪. প্রশ্ন: হ্যামলেটেড জনবসতি (Hamleted Settlement) বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: কিছু জনবসতি কয়েকটি এককে বিভক্ত হয়ে যায় এবং একে অপরের থেকে ভৌতিকভাবে পৃথক থাকে, সেগুলিকে হ্যামলেটেড জনবসতি বলা হয়। এই ধরণের জনবসতি মধ্য ও নিম্ন গাঙ্গেয় সমভূমি, ছত্তিশগড় এবং হিমালয়ের নিম্ন উপত্যকায় দেখা যায়।
১৫. প্রশ্ন: বিচ্ছিন্ন জনবসতি (Dispersed Settlement) বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: বিচ্ছিন্ন জনবসতি হলো এমন জনবসতি যা বিচ্ছিন্ন বা এককভাবে অবস্থিত। এই ধরনের জনবসতি মেঘালয়, উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ এবং কেরালার কিছু অংশে দেখা যায়।
১৬. প্রশ্ন: রৈখিক বিন্যাস (Linear Pattern) জনবসতি কোথায় দেখা যায়?
উত্তর: এই ধরণের জনবসতিতে বাড়িগুলি রাস্তা, রেলপথ, নদী, খাল, উপত্যকার ধার বা একটি লেভির পাশ দিয়ে অবস্থিত হয়। পাহাড়ি এলাকায়, এই জনবসতির বিকাশ মূলত ভূখণ্ড এবং ভূসংস্থান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
১৭. প্রশ্ন: আয়তক্ষেত্রাকার বিন্যাস (Rectangular Pattern) জনবসতি কোথায় গড়ে ওঠে?
উত্তর: এই ধরণের গ্রামীণ জনবসতি সমভূমি এলাকা বা প্রশস্ত পর্বত-সংযুক্ত উপত্যকাগুলিতে পাওয়া যায়। রাস্তাগুলি আয়তক্ষেত্রাকার হয় এবং একে অপরকে সমকোণে ছেদ করে। এই বিন্যাসটি উৎপাদনশীল পলল সমভূমি এবং প্রশস্ত পর্বত-সংযুক্ত উপত্যকায় বিকশিত হয়।
১৮. প্রশ্ন: বৃত্তাকার বিন্যাস (Circular Pattern) জনবসতি কীভাবে গড়ে ওঠে?
উত্তর: বৃত্তাকার গ্রামগুলি হ্রদ, পুকুর বা ট্যাঙ্কের চারপাশে গড়ে ওঠে। কখনও কখনও গ্রামটিকে এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয় যে কেন্দ্রীয় অংশটি খোলা থাকে এবং এটি বন্য প্রাণী থেকে রক্ষা করার জন্য পশুদের রাখার জন্য ব্যবহৃত হয়।
১৯. প্রশ্ন: তারকা আকৃতির বিন্যাস (Star like pattern) জনবসতি কী কারণে গড়ে ওঠে?
উত্তর: যেখানে একাধিক রাস্তা এসে মিলিত হয়, সেখানে রাস্তাগুলির পাশে ঘর তৈরি হওয়ার ফলে তারকা আকৃতির জনবসতি গড়ে ওঠে। এই ধরণের জনবসতি উত্তর-পশ্চিম ইউরোপ, ইয়াংসেকিয়াং-এর সমভূমি এবং শতলুজ-যমুনা সমভূমির গ্রামাঞ্চলে দেখতে পাওয়া যায়।
২০. প্রশ্ন: গ্রামীণ জনবসতির অবস্থানকে প্রভাবিত করে এমন দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌত কারণ উল্লেখ করুন।
উত্তর: গ্রামীণ জনবসতির অবস্থানকে প্রভাবিত করে এমন দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌত কারণ হলো:
জল সরবরাহ (Water Supply): সাধারণত গ্রামীণ জনবসতিগুলি নদী, হ্রদ এবং ঝর্ণার মতো জলপথের কাছে অবস্থিত হয়, যেখানে সহজে জল পাওয়া যায়।
জমি (Land): মানুষ সাধারণত উর্বর জমির কাছাকাছি বসতি স্থাপন করতে পছন্দ করে যা কৃষির জন্য উপযুক্ত।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন