সুনা দিদি
-আমির হোসেন
দিদির মায়া বৃক্ষ ছায়া ভালোবাসে কত
তাঁর অভাবে যাচ্ছি মরে হৃদয় হচ্ছে হত।
মা গো তুমি নিষ্ঠুর এত? দিদিরে দিলে বিয়ে
দোহাই লাগে মা গো তুমি; দিদিরে আসো নিয়ে।
আমার দিদি বড্ড সোনা আসবে আবার ফিরে
জরিয়ে থাকবে সেই পাগলিটা চারিদিকে ঘিরে।
তার গায়ের ঘ্রাণে ঘুমাই আমি, দূরে গেলেই উঠি
নিদ্রাদেবী কদিন থেকে দিয়েছে আমার ছুটি।
সত্যি মা গো ঘুম আসে না আমার দুটি চোখে
এবার আমি মরেই যাবো সুনা দিদির শোকে।
খাইয়ো না আর তুলসী পাতা মুকুল তিক্ত ভাটি
দেখব যখন সুনা দিদিকে, করব না কান্নাকাটি।
দিনে দিনে বাড়ছে অসুখ, পড়ছে দিদির কথা
যন্ত্রনা আমার নেই গো দেহে লাগছে বুকে ব্যাথা।
দিদিরে কেন বিয়ে দিলে ঢুকছে না তো মথায়
‘পরের বাড়িতে যা বুঝবি তখন’ বলতে কথায় কথায়।
বুঝেছি মাগো বাস না ভালো আমার দিদিটাকে
দিদিমা কি দিদির মতো তারিয়ে ছিল তোমাকে।
সুনার বিয়েতে কাঁদলে মিছে আঁচল চেপে মুখে
দিদিকে ছাড়া এখন তুমি বড্ড আছো সুখে।
জানিনা মা কেমন করে দিদির সঙ্গে ঝগড়া বেধে যায়
সত্যি বলছি মাগো আমি মন তা না চায়।
কদম তালায় মিষ্টি ছড়া পড়াও না তো তুমি
দিদি থাকলে পড়াতো আমায় খুকুমণির ছড়াখানি।
প্রশ্ন
আমি তোমায় খুঁজেছি,
আকাশে, মন্দিরে, মসজিদে, নদীর জলে,
তুমি কোথাও ছিলে না,
শুধু মানুষের মুখে তোমার গল্প ছিল। কিন্তু আজ তাও বিজ্ঞান কেন নিল।
তুমি নাকি সর্বশক্তিমান?
তবু এক শিশুর কান্না থামাতে অক্ষম।
তুমি নাকি দয়ালু,
তবু যুদ্ধের আগুনে পোড়ে তোমারই সৃষ্টি মানু।
তারা বলে—
“সবই তোমার পরীক্ষা।”
আমি বলি—
যে ব্যর্থতার ভয় পায়, সে-ই পরীক্ষা নেয়।
হয়তো তুমি নেই,
অথবা আছো, কিন্তু নীরব;
কিন্তু আমি আমার বিবেকে, যুক্তিতে, ভালোবাসায়
তোমার জায়গাটা পূর্ণ করেছি —
কারণ মানুষই মানুষকে বাঁচায়,
ঈশ্বর নয়।
আমি তোমায় অস্বীকার করি না ঘৃণায়,
অস্বীকার করি দায়বদ্ধতায় —
যাতে অন্যায়কে আর “ইশ্বরের ইচ্ছা” বলে চুপ না থাকি।
আমার অপরাধ
-আমির হোসেন
দূর হতে দূরে ডাক যদি সুরে
শুনিতে পাবে আমার আর্তনাদ।
দূর হতে দূরে দেখ যদি ঘুরে
দেখতে পাবে আমার অশ্রুপাত।
বলে ছিলে তুমি চলিবে ভূমি
হাতে রেখে হাত।
সেই কথার বলে পরেছি জালে
এই কি আমার অপরাধ।
সত্যিকারের প্রেম দেখিয়া এলেম
মিলন হয় না ভবে।
মনে আমার প্রশ্ন জাগে,
এ প্রেম সত্যি ছিল তবে?
বুঝিতে পারিনু যখন হয়েছি তোমার
দেখি তখন হৃদয় জখম করেছ পারাপার।
প্রভাত কালে হস্ত গালে
ভাবি তোমার কথা।
ভাবলে বেশি হৃদয় পেশি
ততই করে ব্যাথা।
বক্ষ মাঝে তির ছুটেছি অধীর
আছি বসে তোমার পানে
ভালোবাসি কত নক্ষত্র শত
রয়েছি তাই অভিমানে।
কাছে ছিলে আমার ভাবিনি হারাবার
বলিনি অন্ত কথা।
চাই শুধু হয়ে বধূ
সুখে থাকো সদা।
কেউ একজন
আমির হোসেন
অনেক দিন বাদে এক গভীর রাতে
উঠলো তার স্মৃতি প্রাণ পানে।
হঠাৎ করে তার স্মৃতি জানি না তো! কে জানে!
বলতো যদি সে কাছে এসে ভালোবাসি তোমায়।
হতাম আমি স্বর্গবাসী তার পোড়া হাতের ছোঁয়ায়।
চুল তার মানাবে হার দূর আকাশের মেঘ গুচ্ছ
তারি পেলে এ জীবনে সবই হত তুচ্ছ।
বরফ জলে দেহ গলে যেমন হয় রে সাজ
তেমনই ছিল শান্ত ভারি তাহার ওই মেজাজ।
রাগলে পরে ভীষণ ভয়ে যেতাম কাছে তার
মন ছিল যে বিশাল কঠিন মস্ত রড় পাহাড় ।
মাঝে মাঝে সে অভিমান করে বলতে না কথা
কত রাগ কত ডাক দিয়ে ছিল মনে ব্যথা ।
অনেক দূরে আছে যে সে নতুন মায়ার চাদরে
হয় তো সে থাকতো না আমার কাছে আদরে!
বুনু
আমির হোসেন
কত এল কত গেল সব শেষে ভাবি
মেজাজি বুনুটাই ভালো।
বাহু তুলে আমার ঘাড়ে দিত যখন হাত
মায়ার ভরে আস্তে করে হয়ে যেতাম কাত।
নিষ্পাপ ফুলের কলি করতো সে বলা বলি
আমার সাজকে নিয়ে
" হবে না তোর কোনো দিনও সুন্দরী মেয়ের সাথে বিয়ে।"
মায়ায় ভরা চক্ষু তাঁহার চন্দ্র তুল্য মুখ
ভাইয়া বলে কতো যে আমায় দিয়েছিল সে সুখ।
রাগলে পরে ভীষণ ভয়ে যেতাম কাছে তার
মন ছিল যে বিশাল কঠিন মস্ত রড় পাহাড় ।
মাঝে মাঝে সে অভিমান করে বলতে না কথা
কত রাগ কত ডাক দিয়ে ছিল মনে ব্যথা।
দুষ্টু ভারি মনটি তাহার ছিল না কোনো পাপ
" বুনু বলবি, আপু বলবি" ছিল যে কত চাপ।
সে গুল এখন হয় না বলা অনেক দূরে সে
আশায় আছি যদি আবার ফিরে আসে দেশে।।
পূজা তারা
আমির হোসেন
পূজা তারা মায়ায় ভরা শুক্ষ্ম তাহার চুল
তারি দেখতে কদিন থেকে মন যে বড় ব্যাকুল।
বুঝি নাই রে কেমন করে হোইল সে আপন
ভাবতে আছি বললে বাঁচি ভাবছি রে প্রাণ পন।।
চক্ষু তাহার মায়ায় ভরা কাজল ভরা পাতা
দুই বছরের সেই অগাধ স্মৃতি মনে আছে গাঁথা।
বলতো যে সে হাসির ছলে -এটাই বড্ড ঠিক
সুন্দর জামা খানি গো লেখা ছিল মস্থ রড় ম্যাজিক।
বন্যা এলে জলের তলে লয় না ছোটো ঘাসে
ভালো মানুষ ভালো বই জানা যায় সর্বোপিছে।
তাই তো বলি শহর গলি সহজেই মেলে খোঁজ
চিনবে তারি তুমি যারি স্বপ্নে দেখ রোজ।।
বন্ধু বিদায়
আমির হোসেন
বাহু তোলো স্মৃতি ভুলো আর ঝড়াই ও না আঁখি।
যেটুক স্মৃতি আছে চোখে সেটুকুও মুছবে নাকি?
শত স্মৃতি শত কীর্তি হৃদয় পানে জমা
তাই কাল ক্ষণে আপন মনে করে দিও ক্ষমা।
সুন্না নদীর ঘূর্ণিপাকে নামল হঠাৎ ঝড়
সময় ব্যাবধানে আজ থেকে সবাই সবার পর।
জীবন পথে চলতে যেতে যদি হই গো মুখোমুখি
ভেবে নিও বন্ধু তোমার মতো আমিও আছি সুখী।
বিদায়ের শ্রেষ্ঠ ক্ষনে যত কথা আছে মনে
অন্তর ভাষা দুই নয়নে; বলে দাও সব
মায়াময় বিশ্বভূবন সবকিছু হয় না চয়ন
তবুও করে নিতে হয় বিদায় বরণ।
বিধাতার বিধান সেটা; সব কিছু থাকে না বাঁধা
এই তো জীবনের কঠিন ধাঁধা।
থাকবে তুমি আজীবন এই মানব হিতায়
তাই তো হেসে সর্বশেষে বলবো বন্ধু বিদায়।
রক্ত
আমির হোসেন
পক্ষী হইতে নীড় ব্যথা হইতে বীর
রক্ত মায়াময়
অভিমানে ঘেঁড়া ক্রুদ্ধতে ছেঁড়া
সে ঘৃণা নয়।
মৃত্যু সদা পরিত্রাণ পথযাত্রী নাহি অভিমান
প্রস্থর চাইতেও শক্ত
বিরহ ব্যথা কান্দে একা
রক্ত দেখিতে পায় না রক্ত
ধন-সম্পদ মনোময় তবু রক্তেরি জয়
সে সদা পাসে রয়।
ক্ষমা করো নাহি বিচ্ছেদের ভয়।
তুমি
আমির হোসেন
পূর্নিমা রাতে পবন স্নিগ্ধ শোভন
তাহার বিহনে শূন্য ভূবন।
ধন রত্ন বিনা কুবের প্রতিমা
হয় জরাজীর্ণ।
লক্ষ যোজক যায় না চক্ষু পলক
তবু প্রেম হয় না সংকীর্ণ।
ফাল্গুনে পত্র মোচন। বিহনে মন
তোমা ছাড়া কেউ নেই আপন।
আমাকে যেতেই হবে
আমির হোসেন
আমাকে যেতেই হবে
বসন্ত এসেছে,
সেই কোকিলের কোমল সুর।
আমাকে খটকা দিয়েছিল,
সেই হ্রদের পাশে।
বাঁশঝাড়ের রজনী শুরু হয়েছে
কোকিলের ডাক।
শঙ্কুর ডাকে সাথে এবার উঠবে,
এই আকাশে তারা।
কোকিলের ডাকে এবার রাতও দেবে সারা।
আমাকে যেতেই হবে।
সেই বাঁশ বাগানের কাছে,
কারণ সেখানে কোকিল
প্রত্যাশা করে ডাকছে।
সে দিন রাতে
আমির হোসেন
সেদিন রাতে পরেছিল মনে খুব করে তোমাকে
এক প্রহর ধরে বৃষ্টি হয়েছিল; আমার চোখের দিকে
তাই নিদ্রা দেবীও ব্যার্থ হয়েছিল ঘুম পারাতে।
বৃষ্টির পরে আকাশ যেমন স্বচ্ছ নীল হয়
তেমনি কেঁদে হয়েছিল আমার সরল হৃদয়।
কল্পনা করি, হতে যদি পরি; তবু পেতাম না তোমায়
তোমায় ভেবে রোজ নিশিতে, এ আঁখি মধ্যরাতে ঘুমায়।
পেতাম যদি তোমায় পূর্নিমা রাতে
রাখতে মাথা আমার হাতে;
কেশবতী তুমি রাখতে কেশ আমার নয়নে
তাহার ফাঁকে তাকিয়ে থাকতাম শূন্য গগনে।
মনে পড়ে তারে
আমির হোসেন
মনে পড়ে তারে
কালো আঁধারি রাতে ।
সদা কল্পনার সদা ভাবনায়,
থাকত যদি সে,
যদি ভাগ্য থাকে লেখা,
যদি পাই তার দেখা।
বলবো কি -কেমন আছো।
নাকি চোখ মুছতে মুছতে
পিছু ফিরে চলে যাব একা।
হাজার মেয়ে দেখেছি
লজ্জায় ক্ষনিকেই চোখ ফেলেছি।
কিন্তু তার মুখ,
বাইয়ে এনেছিল অনেক খানি সুখ।
চক্ষু মায়ার অতল সাগরে
বাস্তবকে ভুলে গিয়ে ।
ভালোবেসেছি তারে
বাঁচার আশা নিয়ে।
বাঙালি
আমির হোসেন
বাঙালির মন বাঙালির গান দে দে ভগবান
বাংলা আমার মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলি
তাই তো সরল বাঙালি হয়ে সরল বাঙ্গালীর মতো চলি।
এ কেমন গো বাঙালির সবুজ শস্য থেকে ভরে যায় মন এ বাঙালির কেমন জীবন।
শস্যের জন্য মাঠে ঘাটে চাষী।
মনের সুখে কাজ করে সারাদিন হাসি হাসি
তাইতো এত কষ্টের পর বাংলাকে ভালোবাসি।
না বাসার উপায় কি আমরা যে বাঙালি।
ঘুম থেকে উঠে জল পান করে মাঠে যায়
সেখানে কাজ করে ভাত খায়।
তারপরের বেলায় পেট খালি
এইভাবে কষ্ট করে চলে আমাদের মত বাঙালি
এত ভালোবাসার পরেও দিবি না ভগবান আরেকটু প্রাণ
এ বাঙ্গালীর কেমন জীবন বন্যাকে করে না ভয়
সূর্যের তাপ কে করে জয়।
সারাদিন ত্বকে লাগায় রোদ সূর্যের কিরণ
এ বাঙালির কেমন জীবন।
তাকেও গলে না মন তবু রোদে থাকে সারাক্ষণ
এ বাঙালির কেমন জীবন।
এ বাঙালির কেমন জীবন।
সেই মেয়েটি
আমির হোসেন
সেই মেয়েটি যার
স্বপ্ন ছিল হাজার।
জরাজীর্ণ রক্ত দেহে
কারা যেন গিয়েছে থুয়ে।
ভগবান তুল্য ডাক্তার সে
বাবা মার এক আদরের মে।
পাহাড় সমান স্বপ্ন নিয়ে
দুদিন পর যার হত বিয়ে।
কে সে নরপিশাচ
করল সে সর্বনাশ।
দূর্গা তুল্য দেবীকে,
না পরলে ধরা সবার আগে
দেবীর পায়ে বিলিয়ে দিব নিজেকে।
হে দেবী দুর্গা, যেও না তুমি গলে
লুটিয়ে আছে সেই পাষন্ড তোমার পদতলে।
নামিয়ে দাও তার গলায়
তোমার অস্ত্র খানি।
রক্ত তা নয়, যা পাও ভয়
এক পাষন্ডের রক্ত পানি।
জীবন
আমির হোসেন
জীবন পথে চলা সেই পথিক
নেই কোন তার গন্তব্যের দিক।
চলছে তো চলছে,
কোথায় যাচ্ছে সে?
সুখের দেখা পেতে।
সুখ তো ঘরে বসেই পাওয়া যায়।
কিন্তু যাচ্ছে সে কোথায়?
মায়াময় জগতটাকে ছাড়িয়ে,
সুখের নেশায় নিজেকে হারিয়ে।
যাচ্ছে সে কোথায়?
ক্ষুধার্ত শরীর নিয়ে সে
আরো চলতে চায়।
কার সুখ ধন-রত্নে।
কার সুখ ভালোবাসায়
সব আছে মানব জীবনে
প্রত্যেক দশায় দশায়।
দীর্ঘশ্বাস
আমির হোসেন
সুন্দর হরিনের মতো বুকে নিয়ে ক্ষত
ছাড়ে সে দীর্ঘশ্বাস।
নিষ্ঠুর তীরে বক্ষ ছিঁড়ে
পরে আছে এক জ্যান্তলাগ।
সংসার মায়া ছাড়িয়ে প্রলয় নেশায় হারিয়ে
এসে ছিল সে কোন সুখে?
বাড়ছে বিরহ ব্যাথা মনে পরছে সখির কথা
পুড়ছে তাই থুকেথুকে।
সাত সমুদ্র তেরো নদী পার এসেছিল এক দ্বীপে
বাকযন্ত্র তার স্বচল ছিল তাও গেল নিভে |
নির্বাক হয়ে একা দ্বীপে পুড়ছে বসে বসে
ভেবেছিল সে অনেক আগে
অর্ধ পাগল হয়ে তাই একাই একাই হাসে।
কত সুন্দর দেখেছে হরিণী
কত সুন্দর দেখেছে পাখি।
সবই আছে তাহার কাছে
তবু কেউ একজন থাকল বাকি।
মন যাহা চায় এ তাহা নয়
তাই দেখে ভরে না হৃদয়।
প্রত্যেকটা দীর্ঘশ্বাস মনে যে করে বসবাস
তাকেই পড়ে মানে।
সব বেদনা সব যাতনা দূরে যাবে
দেখে যদি চক্ষু কোনে।
ভেবেছিল সে সাজাবে নতুন করে
নিজের জীবন খানি।
পিছুটান মায়া ছাড়ছে না ছায়া
করছে তাই টানাটানি।
ভুলে যদি যেত অনেক সুখ পেত
নতুন দ্বীপে,
ভুলতে পারে নাই ভাবছে অযথাই
তাই চোখ যাচ্ছে একটু একটু করে নিভে ।
হে আমার মাতৃভূমি,
আমির হোসেন
হে আমার মাতৃভূমি হাসো হাসো হাসো
আরো ভালোবাসো ।
কোলাপে করে করলাম তোমায় উদ্ধার এই ভারতে দেখি যেন অনেকগুলো সদ্ধার।
হে আমার মাতৃভূমি ভুলোনা আমাকে
ভালোবাসি শুধু দুচোখ ভরে তোমাকে।
ভালোবাসা যদি বৃথা যায় সে জীবন মিথ্যা হয় ভালোবাসা থাকা ভালো না হলে সেই জীবন কালো।
যাইহোক আসো আসো আরো ভালোবাসো
শুধু ভারতবাসীকে।
ভাঙা কুঠিরের সারি আগুনে পরে মরি
হে আমার মাতৃভূমি।
যমজ মোরা
আমির হোসেন
যমজ মোরা বিশ্ব ধরা জানুক আর একবার
এক বাংলায় আর জি কর ,
এক বাংলায় রাজাকার।
একটি মাতৃগর্ভে ছিল দুই ভাই,
চক্রান্ত বশে স্বাধীনতা শেষে ভিন্ন নামে হল ঠাই।
কিন্তু যমজ মোরা জানে বিশ্বধরা,
একসঙ্গে কাঁদি এক সঙ্গে হাঁসি,
দুঃখ কালে তাই থাকি পাশাপাশি।
দুঃখ মোদের ভিন্ন হতে পারে গর্জন মোদের এক,
ভাতৃত্ব বোধ যাইনি আজি করেনি অন্তত্যাগ।
জেনে নিও ভাই মরলে পাশাপাশি হবে ঠাই,
আলাদা থাকতে পারি কিন্তু প্রতিবাদ ভূলি নাই।
দুই পক্ষী
আমির হোসেন
পক্ষী নীর বেদনায় অধীর আসে নাই ফিরে নীরটাতে
চারিদিকে দুঃখ সাগর; চেয়ে ছিল একটুখানি সুখ
সেও পাখি অনেক দূর করেছে তাই নিঃশ্চুপ।
প্রতিক্ষার প্রহর গুনে অশ্রু ক্ষরন দুই নয়নে।
পাহাড় সমান অভিযোগ নিয়ে;এক পাখি
গেল হাড়িয়ে; এক পাখি আছে দাঁড়িয়ে;
জখম হয়েছিল সে; এক শিকারির নিষ্ঠুর তিরে।
সুযোগ বুঝে ছাড়লো বুলি, বাঁধলো বাসা নতুন নীরে।
মাস কেটে গেল, বর্ষ পেরিয়ে এল,
অনেক খুঁজেছে সে, তবু খুঁজে পায়নি তারে।
নিজস্বার্থে খুঁজলে না হয়, খোঁজা দিত ছেড়ে
খুঁজতে আছে, তুলে দিতে তাহার স্মৃতিটারে।
সেই স্মৃতি বুকে নিয়ে খুঁজেছিল হাজার পথে
চলতে চলতে কভু যদি দেখা হয় তাহার সাথে।
কখনো কখনো সে ভাবে, যদি ফিরিয়ে না নেয় তাহা
প্রাণের থেকে প্রিয় একদা ছিল যাহা।
পরক্ষনেই ভাবে না নেয় তবে, রেখে দিব নিজের কাছে,
জীবনে থাকার মতো এই তো আছে।
হঠাৎ করে পরল মনে জখম পাখিটারে।
যার কাছে রেখে ছিলো নিজের বক্ষটারে।
নিয়ে আসতে চাইল তারে, শুনেই গর্জে উঠে
ব্যক্ত করে নতুন নীরের নতুন পাখি,
অন্য ঘরের অপত্য তুমি কেমনে কর পারন
না হবে না এ আমার শত শত বার বারন।
শুনিয়া অবুঝ পাখি ভাবে,
এরি লাগি মাতৃজগতে কলঙ্ক হলাম তবে।
তাই ছুটিয়া যায়, ভিতু হরিণী যেমন লাফায়
নিজের পুরানো ঠিকানায়।
কিন্তু কে জানে সে এখন অপেক্ষায় আছে,
অঙ্গি শুধু তাহার পড়ে প্রাণ নেই আর তাতে।
শেষ স্মৃতি টুকু জরিয়ে আছে এখনো তার হাতে।
ঈশ্বর
আমির হোসেন
দুচোখ বুঝে তোমায় ডাকি,
মনে প্রানে ভালবাসি।
অন্ধকারে থাকো নাকি?
শব্দে তোমায় এত ডাকি তুমি শুনতে পারো নাকি।
যখন তোমায় প্রার্থনা করি
মনে হয় আমিও তোমায় ডাকতে পারি।
কি বলবো যাই ভুলে মনটা আমার অচিন কূলে
জেগে উঠে দেখি সবই কল্পনা
মিছিমিছি হল এত আমার যন্ত্রণা।
গোলাপ
আমির হোসেন
সমুদ্র যেমন আড়াল করে
একূল থেকে ওকূল।
বাগিচাও তেমনি করে ছিল
আড়াল একটা গোলাপ ফুল।
কিন্তু শত শত পত্র মাঝে
পৃথক করে ছিল আজ
তাজা রক্ত অঙ্গে নিয়ে
আলাদা এক সাজ।
ঝড় বাদলে কে জানে
কোন পাড়ার কোন্ চতলে।
উড়ে এলো এক নির্দয় পতঙ্গ।
পূর্বজন্মের অধিকার থেকে
নির্দয় যোদ্ধার তিরের মতো
পাপড়িতে করল ক্ষত।
বিলিয়ে দিল নিজের অঙ্গ।
গোলাম সে তো অবুঝ ছিল
অঙ্গ মায়ায় সেটা মানিয়ে নিল।
তপ্ত দুপুর কেউ একজন
বাজিয়ে নূপুর।
এসেছিল বাগিচায়
ফুল দেখেই মাথায় হাত -"হায়"
দুদিন আগের সেই সুন্দর ফুল খানি
পড়ে আছে এই বেহাল অবস্থায়।
এক সময় যে পতঙ্গ ছিল
সব শেষে সে তো উড়াল দিল।
ভাবনার স্বাধীনতা
আমির হোসেন
পতেকা উড়ে বাঁশে
পাতা নড়ে গাছে।
স্বাধীনতা কি কোনদিনই আসে?
এই স্বাধীন সেই স্বাধীন নয় গো নয়
এই স্বাধীন নিজের ইচ্ছায় লড়া
নিজের ইচ্ছায় কোন কাজ করা।
এই স্বাধীনতা কি কোনদিনই পাওয়া যাবে?
আজ নয়, কাল নয়, কোন দিনই নয়,
এই স্বাধীনতা কোনো আইনে বাধা নয়
যদিও হয় ভালোর চেয়ে হবে বেশি ক্ষয়।
কেউ এই স্বাধীনতা চায় না পাবেও না
আজ নয় কাল নয় কোন দিনই নয়।
লড়ব আমরা
আমির হোসেন
লড়বো আমরা, ধরবো আমরা
ভারতের পতাকা।
হবে জয় করো না গো ভয়
ভয় হচ্ছে উন্নতি চলছে গাড়ি
করো না ভাই মারামারি।
ভারত আমাদের ধর্ম, ভারত আমাদের কর্ম।
আমরা ভারতবাসী সবার মুখে শুধু হাসি।
এটাই আমাদের ধর্ম।
থাকব একজোটে চলবো এক দলে
এটাই তো আমাদের মাতৃভূমি বলে
ভূলো না গো ভাই কোনো এক সময়
ব্রিটিশ ছিল আমাদের সরকার।
তখন ভারতবাসীর ছিল না ভারতে
কোনো অধিকার।
যদি আমাদের ধর্মের চশমাটা খুলে ফেলি
তবে বুঝতে পারব কেমন অবস্থায় আমাদের মাতৃভূমি তাইতো বলি দিও না ভারত মাতা কে কষ্ট
না হলে হয়ে যাবে ভারত সভ্যতা নষ্ট।
সবাই ভুলে গেছে
আমির হোসেন
জীবন যুদ্ধের প্রথম অধ্যায়ে সংঘর্ষ হয়েছিল দুই মানবীর সাথে।
চলতে চলতে বলতে বলতে প্রিয় হয়েছিল নিজের অজান্তে।
দু'জন বলেছিল, আম'র মম বিয়া কালে দাওয়াত দিব তোরে।
সেই কথা ভুলে গেল বাতাস বইছিল অঝোরে।
কালক্রমে তাও হারিয়ে গেল দুই জনের দল
সত্যি মায়ার বশে অনেক বলা যায়, সময় হলে তা হয় নিঃশ্চল।
উপনদী থেকে পরিলাম মূল জীবন নদীতে
অলৌকিক ভাবে সেথায় দেখা হল চার' মায়াবীর সাথে।
মায়ার বন্যা এতই তীব্র ভাসিয়ে নিয়ে যায়
লক্ষ্য বালি থাকে না যেন নিজের কিনারায়।
সময় স্রোতে হয়েছি ত'ন জনের প্রিয় অনুজ
সবই তাদের মিথ্যা ছিল, আমার ছিল না তো বুঝ।
প'ম বলেছিল, তোর বিয়াতে এক সপ্তাহ আগে যাব তব বাড়ি।
এখন ভাবি মরার পর সপ্তবর্ষ পরেও দেখা হবে না তো তারি।
স'হ বলেছিল বাহু ধরে, কোনো দিনও হাত ছারবে না তো আমার।
সব মিথ্যা, বিয়া হল, তনয় হল,
তবুও দেখা হোইলো না তো একটি বার।
কিন্তু যারে ভাবিনি আপন
এখন দেখি সেই সুনা বিশ্ব দেখার একটি মাত্র নয়ন।
ঘুড়ি
আমির হোসেন
আহা ঘুড়ি উঠে যা আকাশের দিকে
সারাজীবন বন্ধুই থাকবি দিয়ে যা লিখে।
চাঁদিয়াল, পেটকাটি কত তোদের নাম
উঠে যাস কত গাছের উপর দিয়ে
-আম, জাম, তাল।
দিয়ে যাস হাতে শুধু দড়ি
তুই আমার প্রিয় বন্ধু ঘুড়ি।
বাতাস পেলে উঠিস তুই আনন্দে
উড়তে দেখে চিল্লাই মোরা উল্লাসে।
তোর কাছে শিক্ষা পেলাম জীবনে শুরু শেষ আছে
কখন তুই থাকিস পেপার কখনোবা জির্নো হয়ে গাছে।
তোর ওখানে বন্ধু হবে কত রঙের পাখি
সেখানে থাকবে সবাই আমি থাকবো বাকি।
সত্য
আমির হোসেন
সত্য নিয়ে চলি আমি
সত্যি কথাই বলি।
সত্যের জন্য দিতে পারি
আমি নিজের বলি।
লক্ষ - কুটি মানুষের কাছে
থাকে লক্ষ - কুটি টাকা।
সত্য একটা এমন জিনিস
হয় না সবার পক্ষে রাখা।
সত্য নিয়ে চললে কভু
হয় না কোনো ক্ষতি
দুঃখের সময় সত্যই দেখাবে
সুখের দিশায় বাতি।
এই যুগেরি এমন দশা
মিথ্যা সবার ঘাড়ে ঠাসা।
সত্য কথা বলতে গেলে
হয় জরিমানা।
সৎ পথে চলতে গেলে
বুকে পড়ে হানা।
সেই দিন আসবে কবে?
যে দিন সবাই সত্যের সঙ্গী হবে
একসঙ্গে উঠবে বলে - আমরা সত্যবাদী
সত্য নিয়ে চলবো মোরা
এটাই আমাদের দাবি।
ভালো নেই ভালোবাসা
নিকৃষ্টের এক দূর্লভ আশা।
তাই ভালো নেই ভালোবাসা,
কুটি মূল্যের এক রত্নের মতো।
নির্ভয়ে থাকতো সাজানো।
ঝিনুকের খোলোস যেমন
আগলে রাখে,
পরে না যেন মুক্ত কোনো তীক্ষ্ণ আলোয়,
কোনো ঘুর্নিপাকে।
সেই মুক্ত তবু লুকিয়ে দেখে।
তার কাছে সবি রঙিন
এই নীর - এই পবন।
তাই দেখায় না মুক্তকে এই মিথ্যা ভুবন।
কত স্মৃতি এক মধ্যাহ্নের স্বপ্ন যত।
গগনে শত রবি আজ তাঁরার মতো।
শত আদর, অভিমানের চাঁদর।
জরিয়ে বুকে
জোর গলায় বলেছিল,
ভালো বাসি তোকে।
এখন তা মনে হয়
সব ছলনা, সব মিথ্যা আশা।
তাই ভালো নেই ভালোবাসা।
চিরস্মৃতিময়ী
-আমির হোসেন
তুমি জল তুমি ঢেউ
তুমি সবচেয়ে কাছের মানুষ
আবার তুমিই আচেনা কেউ।
আজ থেকে বছর তিনেক পরে
হবে না বেরানো;
হবে না ফেরা একসঙ্গে ঘরে।
পরিবর্তনের নিষ্ঠুরতায়
মন যা চায় তাই হারায়।
দিগন্তের ওই প্রান্ত ভাগে।
যুগ যুগ যুগান্তরে।
কত প্রেম ঝরে পড়ে
ডাল ভাঙ্গে গাছ মরে
তবু; পাখি চেয়ে থাকে
সেই বাসার তরে।
তবুও তো জোয়ার আসে ।
অভিমানী বোন
-আমির হোসেন
একজন বাড়ির কর্তার মতো মিরাফকে সংসারের সমস্ত দায়িত্ব পালন করিতে হইলেও অনেক জনের দায়িত্ব কাঁধে নিয়া বাইয়া বেড়াইতে হয় না কারণ তাহার অনেক জনের সংসার নয় দু-জনের সংসার। দুঃখ সুখের প্রকাশ যেখানে, অভাব হলেও সেখানে সুখ থাকে। তাই দুজনে একে অপরের সামান্যতম সুখ দুঃখের ভাগিদার।
আজ একটা কাজের কাজ করিয়াছে জিরাফ। তার ছোট্ট সংসারের বিরাট বড় দায়িত্ব পালন করিতে যাচ্ছে। তাহাকে ভীষণ খুশি দেখাইছে। তাই বাড়ির ফটকে আসিয়াই - পেত্নী, পেত্নী করিয়া বোনকে ডাকিতে লাগিল। সুনা তখন রান্না ঘরে উনুনে ফুঁ দিয়া দিয়া নিজেকে আস্ত একটা পেত্নী সাজিয়া তুলিয়াছে। দুই রাগে সুনা বিদ্যুৎ বেগে বাহিরে বেড়িয়া আসিয়া কইতে লাগিলো - এই বাড়িতে আর এক মুহূর্তও থাকব না। এই রাড়ির একটা জিনিসও ঠিক-ঠাক পাওয়া যায় না। জলন্ত আগুন যেমন নিভিয়া গেইলে ক্রমে শীতল হোইতে শুরু করে। ঘর থেকে বাইরে বেড়াইতে তাহার রাগও কমিয়া আসিল। এবার একটু ভালো ভাবে কহিল - কি বলবি বল।
মিরাফ তাহার হাতটা ধরিয়া কহিল- বোস কথা আছে।
-বল।
- বিয়া ঠিক করে আসলাম।
দাদার মুখে এরুপ কথা শুনিয়া তাহার সমস্ত রাগ ধুলিসাৎ হইয়া গেল। উত্তেজিত হয়ে কহিল -
-মেয়ের নাম কি? দেখতে কেমন?
-আরে পাগলী, আমার না তোর।
- তোর মানে?
-তোর মানে, তোর।
সুনার প্রথমে অবাক লাগিলেও পরে কেমন যানি লজ্জা করিতে লাগিল। একটু আগে যে কথাটা কহিল তার জন্যে। সত্যি কি সে আর এই বাড়িতে থাকিবে না। দুজনের মধ্যে অজান্তেই ঝগড়া বাঁধলেও ইহাদের মধ্যে যথেষ্ট ভাব আছে। একদিন একে অপরকে দেখিতে না পারিলে থাকিতে পারে না। এই সব ভাবনার মধ্যে জিরাফ কহিয়া উঠিল,
কানু কাকা কহিল -কে যেন তোকে পছন্দ করিয়াছে সে কালকে তোকে দেখিতে আসিবে। মিরাফ আরো কহিল- সরস্বতী পূজোয় যে শাড়িটা পরে ঘুরছিস সেটাই পরবি, আর কি কি লাগবে আমাকে বল। কিন্তু এই সকল কথা সুনার কানে প্রবেশ করিল না শুধু বলিল -না কিচ্ছু লাগবে না।
বোনকে অন্যমনস্ক দেখিয়া সে আর কথা বাড়াইলো না। তাই উঠিয়া নিজের কাজ করিতে বাহির হোইল।
কালবৈশাখী ঝড়ের আগে গগনে যেমন কালো মেঘে ভরে উঠে তেমনি সুনার চাঁদের মতো মুখখানি কেমন যেন আন্ধার হোইয়া গেইল। মনে মনে নিজেকে অপরাধী ভাবিতে লাগিল এই ভেবে যে, সে যদি মেয়ে মানুষ না হোইয়া ছেলে হোইয়া জন্মাইত তাহলে তাহাকে দাদাকে ছাড়িয়া দূরে যাইতে হোইতো না। এই সব ভাবিতে ভাবিতে হঠাৎ তাহার সম্ভিত ফিরিলে সেও নিজের কাজে গেইল।
আজ সোমবার হাটের দিন তাই সকাল সকাল হাট হোইতে মিরাফ বেশ করিয়া খরচা করিয়া আনিল। আজ সুনাকে দেখিতে আসিবে। এর আগে অনেক বারই তাহার দাদার সঙ্গে ঘটক কাকার কথা হোইয়াছিল কিন্তু মিরাফ তা একবাক্যে না করিয়া দেয়। এই বার অবশ্য হ্যাঁ কইবার কারণ আছে। ছেলে ব্যাবসা করে। জমাজমিও আছে বিঘা পাঁচেক। অবশ্য বিয়ের আগে লোককে দেখানোর জন্য সবার একটু বেশিই থাকে।
বাজারের ব্যাগ সুনার হাতে তুলিয়া দিয়া মিরাফ রতন কাকাকে ডাকিতে গেইল। রতন কাকা তাহার নিজের কাকা নয়। তবে তাহাদের দুজনের সঙ্গে তাঁহার যথেষ্ট ভাব আছে। তাই বাড়িতে কোনো কিছু হোইলেই তাঁহাকে খবর দিতে হয়। আজকেও সেই রীতির ব্যাঘাত ঘটিল না। রতন কাকার বাড়ি পৌঁছিয়া সে সব কথা কোইল।
-ছেলেটা বেশ ভালোই। একজন সৎ মানুষের মধ্যে যা যা থাকা উচিত তা সবই তার মধ্যে বিরাজমান।
সব শুনে রতন কাকাও তাহার কথার বিপক্ষে গেইলেন না। এবার শুধু ছেলের বাড়ির লোকেদের মতামতের অপেক্ষা। কাকা এতক্ষণ বাইরে চেয়ারে বসিয়া ছিল। এবার উঠিয়া মিরাফকে কইল তুমি বসো আমি ঘর থেকে আসতেছি । কয়েক মিনিটের মধ্যে কাকা ঘর থেকে একটা সাদা ধুতি এবং একটা পাঞ্জাবী পরিয়া বাহির হোইলেন।
যাইবার সময় মিরাফ কহিল- সুনার মনে হয় রান্নার কাজ শেষ হয়ে গেছে। ছেলের বাড়ি থেকে লোকেরাও মনে হয় আসতেছে।
বাড়ি ফিরিয়া রতন কাকাকে একটা চেয়ার দিয়া ঘরে গিয়া সুনাকে আয়নার সামনে দেখে কইলো কিরে পেত্নী কতদূর। সুনা পিছন ফিরতেই সে অবাক হোইয়া যায় -"হায়" এতো সত্যিকারের চাঁদ, সে নিজেই এতদিন চাঁদের কলঙ্ক হোইয়া তাকে পেত্নী করিয়া তুলিয়াছে। এদের সম্পর্ক বড়ো অদ্ভুত সুন্দর।
ইতিমধ্যে বাইরে কয়েকটা গাড়ির পিপ-পিপ শব্দ শোনা গেইল। কারো ভাবিবার অবকাশ থাকিল না যে এরা কারা। তাই মিরাফ আর বোনের সাথে কথা না কইয়া বাইরে আসিল। সবার জন্য বারান্দায় চেয়ার দিয়া নিজেরও একটা চেয়ারে টানিয়া লইয়া বসিল। অন্য সকলের মতো মিরাফও প্রশ্ন করিল,
-আসতে কোনো অসুবিধা হয়নি তো।
-না, না এদিকের রাস্তা-ঘাট বেশ ভালোই তো।
তাদের মধ্যে থাকা সবচেয়ে বয়স্ক মানুষটা কহিলেন
- তোমার বোন কোথায়। তাকে তো দেখছি না।
মিরাফ খুব ভালো করিয়াই জানে, সে নিজে না গেইলে সুনা কখোনোই আসিবে না, তাই উঠিয়া ঘরে যায়। সুনার হাতে একটা ট্রে ধরিয়া দিয়া দু কাঁধে দুটি হাত দিয়া তাহাকে এগিয়া নিয়া যায়। সুনাকে চেয়ারে বসিয়া দিয়া সে কহিল - কিছু মনে করবেন না আমার বোন একটু বেশিই ছোট্ট।
ছেলের বাড়ির লোকেদের দেখিয়া মিরাফের মনে হোইলো এরা যেন বিয়ের কথা বাড়িতেই ঠিক কোরিয়া আসিয়াছে। তাই দিন কাল পঞ্জিকা দেখে বিয়ের দিন ধার্য্য করা হোইল। ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩১সন (14ই মে 2024 ইং) মঙ্গলবার।
লোকেদের যাইবার পর মিরাফ সুনার পাশে গিয়ে বসিলে সুনা কইয়া উঠিল,
-বিয়েটা কি খুব জরুরী? কয়েক বছর পরে হলে হয় না।
- পরে! পরে হলে চুল সাদা হয়ে যাবে, চামড়া কুঁচকে যাবে। তখন এই পেত্নীটাকে কে নিয়ে যাবে শুনি।
-আচ্ছা দাদা। তুই যে আমাকে সব সময় পেত্নী বলে ডাকিস। আমি কি দেখতে খারাপ? ওরা কি আমাকে পছন্দ করবে?
- পাগলী বোন আমার, বোন যতই সুন্দর হোক না কেন, দাদার কাছে বোন সব সময় পেত্নীই থাকে। তাছাড়া অন্য দশটা মেয়ের সঙ্গে তোর তুলনা হয়না। তুই -না থাক।
মিরাফ জানে তার বোনের সম্পর্কে যত কইবে তত কম হোইবে। তাই কি একটা বলিতে গিয়া মিরাফ আটকিয়া যায়।
সত্যি তো। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কত কাজ করিতে হয় তাহাকে। ঝাড়ু দেওয়া, বাসান মাজা, কাপড় কাচা, হেঁশেল সামলানো, গরুকে খাবার দেওয়া আর কত কাজ। পুরো একটা সংসার সামলানো। সুনা আর কহিল
-ওরা তো বিয়ের দাবি হিসাবে দুলাখ টাকা চাইল। আমাদের তো ভিটা সমেত দুবিঘা জমি আছে একটা বিক্রি করলে তোর কি হবে?
-ও ম্যাডাম। দুদিন পর অন্য সংসারের লোক হচ্ছেন। আমার সংসার নিয়ে আপনার নাক গলাতে হবে না। তাছাড়া আপনি বেড়িয়ে গেলে আমিও একজনকে আনবো। সুনা জানে তাহার মনের কথা এটা নয়। সত্যিই তার বিয়ার বয়স হোইয়া গেছে।
দেখতে দেখতে সুনার বিয়ার দিন ঘনিয়া আসিল। বাড়িতে সবাই ব্যস্ত কেউ বা বলিতেছে হলুদ কে বাদছে। কেউবা জল নিতে কখন যাবে।
সবকিছুর আড়ালে সুনার মনে কিসের যেন একটা ছাপ পরিয়াছে। সে ভাবতেছে দাদাকে ছাড়িয়া সে থাকিতে পারিবে কিনা। চাঁদের আলোয় জোনাকি ধরিয়া আনিয়া হাতে তুলিয়া দিবে কে। তার দাদাকে কে রেঁধে বেড়ে খাওয়াইবে। সুনা একটা কথা অনেক দিন থেকে ভাবিতাছে আগে ছোটোবেলায় খাবার সময় খাবার কম হইলে কাড়াকাড়ি হোইত বেশি হলে ছোঁড়াছুঁড়ি কিন্তু বর্তমানে তার উল্টো। এইটাই কদিন থেকে দাদাকে বলিতে চাইতেছিল কিন্তু কেন জানি না বলিয়া উঠিতে পারে নাই।
বিয়ের দিন যখন সুনা দাদার বুক হোইতে নিজের মস্তক তুলিয়া দাঁড়াইল তখন বুঝিতে পারিল দাদা বীনা সে কতটা একাকী কতটা অসহায়। হয়তো নতুন পরিবার পাইবে কিন্তু পরবর্তী জীবন যতই সুন্দর হোক না কেন অতীতকে ভুলা যায় না। এদিকে মিরাফের মনে হোইল সুনা যেন তার কলিজা ছিল সেই কলিজা ছাড়া তার নিশ্বাস বন্ধ হোইয়া যাইবে।
সুনা শ্বশুর বাড়িতে গেইল। তাহার শ্বশুর বাড়ির লোকেরা বেশ ভালো তাছাড়া শিক্ষিত পরিবার বলে কথা। সুনার শ্বশুর একসময় মাস্টার ছিলেন এখন পেন্সিল পাইয়াছেন। প্রথম কদিন তাহাদের সঙ্গে চলাফেরা করিতে অসুবিধা হোইলেও পরে আস্তে আস্তে সব ঠিক হোইয়া গেল। প্রথম কয়েক মাস সুনার বাবার বাড়িতে আসিত এবং মিরাফের সুনার বাড়িতে যাওয়া ঘনঘন হোইত । সুনার স্বামী চন্দন ব্যবসা করায় তাহার হাতেও সময় নাই তাই সুনাকে আর বাবার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হোইয়া ওঠে না।
অন্যদিকে, মিরাফ সকাল সকাল কাজে বেড়িয়া যায় । কোনো দিন হোটেল কোনো দিন নিজে রান্না করিয়া ভাত খায়। কাজের ব্যস্ততায় রাতে ছাড়া সুনাকে তার মানে পরে না। কিন্তু যখনই সুনা আয়নার সামনে গিয়া দাঁড়ায় তখনই তাহার দাদার দেওয়া ছুঁড়ির দাগটাকে দেখিয়া তাহার কথা মনে পরিয়া যায়। এই দাগটাই তার মুখমন্ডলের সৌন্দর্য আরো বেশ খানিকটা বাড়িয়া তুলিয়াছে।
দেখতে দেখতে আরো একটা মাস পেরিয়ে গেল, কিন্তু দাদা তাহার সঙ্গে দেখা করিতে না আসায় সে অভিমান করিয়া বসিল -দেখি কত দিন ওই জিরাফ আমার সঙ্গে দেখা করতে না আসে। আমাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়ে একাই সুখে আছে।
এদিকে মিরাফের সুনার কথা মনে পরিলে ভাবে,
-কদিন পর সুনাকে দেখতে যাব।
কিন্তু কাজের চাপে যাওয়া হোইয়া ওঠে না।
খুবই অদ্ভুত ডাক। রাগলে পরে একে অপরকে জিরাফ, পেত্নী বলে ডাকিয়া থাকে। যদিও মিরাফ একটু পেত্নী নামটা আদর করিয়াই ডাকে। তাতে সুনা রাগ হয় না।
এমনি করে কাটিয়া যায়, দুটি মাস। এখন সুনার অভিমান পাহাড় সমান হোইয়া উঠিয়াছে।
একদিন রতন কাকা কোনো এক কাজে সুনাদের বাড়ি পাস দিয়া যাইতে হোইলো। যাইতে যাইতে কি একটা মনে করিয়া সুনাদের বাড়ির গেটে গিয়া ডাকিতে লাগিল,
সুনা মা । সুনা মা
তাহার কয়েকদিন ধরিয়া জ্বর হোইবার কারণে বিছানায় পড়িয়া আছে। তাই সুনার শ্বাশুরি বাইরে বেড়িয়া এলেন।
সুনার ঘরে গিয়া দেখিতে পান সুনা বিছানায় শুইয়া আছে। তাহার বুঝিবার বিলম্ব হোইল না যে তাহার অসুখ করিয়াছে। তাই কইলেন- আমি দেরী করবো না। তোকে দেখতে এদিকে ডুকলাম। সুনা অসুস্থ থাকিবার কারনে সেও কিছুক্ষণ থাকিবার জন্য জোর করিল না। এবার মনের সকল অভিমান ব্যক্ত করিয়া কহিল,
দাদাকে বলে দিও । তোমার বোন মরতে বসেছে।
সুনা যে সামান্য জ্বরেই এতো কাতর হোইয়া পরে তা কাকার জানা ছিল না। তাই ফিরিবার কালে মিরাফের কার্যলয়ে ঢুকিয়া তাহাকে কইল,
তোমার বোনের গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আমাকে বললো সে নাকি মরতে বসেছে।
অগ্নুৎপাতের সময় পৃথিবীর বক্ষ হোইতে লাভা বেড়িয়া আসিয়া যেমন সব কিছু ধ্বংস করিয়া দিয়া যায়। বোনের এরূপ অবস্থার কথা শুনিয়া তাহার বুকেও যেন অগ্নুৎপাত ঘটিল। তাই হাতের থাকা সমস্ত যন্ত্রপাতি ফেলিয়া দিয়া বাইকে উঠিয়া পরে। বাইক চলাকালীন তাহার মনে পরিয়া যায় সেই কথা,
আজ চোখের সামনে আছি বলে কতো ভালোবাচ্ছিস। পরের বাড়িতে মরলেও হয়তো দেখতেও যাবি না। তাছাড়া তখন তুই তো অনেক আপন মানুষ পেয়ে যাবি। আমি তো তখন পর হয়ে যাব। ,, আমার কথাটা মিলিয়ে দেখিস।
কবি যেমন ভাবিতে ভাবিতে বাস্তব ভুলিয়া কল্পনার দেশে হারাইয়া যায়। বোনের এইসব কথা তাকেও যেন দেহ ছাড়িয়া অন্য স্থানে নিয়া গিয়াছে। তার শুধুই মনে পরিতে থাকে - আমার কথাটা মিলিয়ে দেখিস। আমার কথাটা মিলিয়ে দেখিস । আমার কথাটা মিলিয়ে দেখিস। ভূলে গেছি- কি আর করার আছে বল।
কথায় বলে 'অভাগা যেদিকে যায় সাগর শুকায়'। তাহার সঙ্গে এমন হোইতে বিলম্ব হোইল না। ড্রাইভিং এ মন না থাকিবার কারনে। কখন যে একটা গাড়ির সামনে লুটিয়া পরিল সে বুঝতেই পারে নাই। তাহার দ্রুতগামী বাইকটা চলিয়া যায় রাস্তার একদিন এবং রক্তাক্ত শরীরটা চলে যায় রাস্তার অন্য এক দিকে। কিছুক্ষণ সে এই অবস্থায় পরিয়া থাকিল । কয়েকটা বকাটে যুবক রাস্তায় তাহার এরূপ অবস্থা দেখিয়া নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়া গেইল।
দাদার অ্যাকসিডেন্টর কথা শুনিয়া অভিমানী বোন চেঁচিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে আসিল। রক্তাক্ত দেহের মাঝে থাকা ছোট্ট প্রাণধারী মানুষটা অস্পষ্ট কন্ঠে কইল,
আমাকে ক্ষমা করিস। আমি।
আরো কিছু একটা কইবার আগে, মুক্তি পাওয়ার বাসনায় থাকা অস্থির প্রাণটা কখন যে বেড়িয়া গেল কেউ দেখিতে পারিল না, কেউ শুনিতে পারিল না, কেউ বুঝিতে পারিল না। সুনা ছোট্টবেলায় নিত্যদিনের পাপ্পির ছোট্ট আবদারটা পালন করিয়া নির্বাক ঝর্নার মতো অশ্রু ঝড়াইতে থাকিল।
মিরাফ হাঁ মালিয়া সুনার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়া রোইল।
চিতায় আগুন ধরিয়া দিয়া সুনা দূরে গিয়া দাঁড়িয়া থাকে। আর ধোঁয়ার মধ্যে দেখিতে পায় দাদার মুখখানি। যে তাহার দিকে তাকাইয়া বলিতেছে ছোট্টবেলার সেই কবিতা -
লক্ষী সোনা রাগ করে না
ওরে ছোটো বোন।
তুই যে আমার নয়ন মনি
সাত রাজার ধন।
ইচ্ছে করছে বোন তোকে
কলিজার মধ্যে রাখি।
চুপটি করে থাকবি সেথায়
করবো না ডাকাডাকি।
তোর পাগল দাদা তোকে ডাকছে
কাছে আয়।
যত খুশী দেনা পাপ্পি
আমার কপালটায়।
পেত্নী পেত্নী বলি তোরে
তুই যে চাঁদের আলো।
আমার চেয়ে কে বেশি
বাসে তোকে ভালো।…..

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন