লুইস মামফোর্ডের নগর বা পৌর জনবসতির শ্রেণিবিন্যাস (Urban Settlement Classification of Town by Lewis Mumford)
ভূমিকা (Introduction)
Lewis Mumford ছিলেন একজন বিশিষ্ট মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী, নগর ঐতিহাসিক, দার্শনিক ও নগর পরিকল্পনাবিদ। তিনি আধুনিক নগর সভ্যতার উৎপত্তি, বিকাশ, পরিবর্তন ও অবক্ষয় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ প্রদান করেন। ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Culture of Cities -এ তিনি নগরের বিকাশকে একটি জৈবিক বা বিবর্তনমূলক প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, একটি নগরেরও জীবন্ত প্রাণীর মতো জন্ম, বৃদ্ধি, পরিপূর্ণতা, অবক্ষয় ও মৃত্যু ঘটে। এই ধারণাকে বলা হয় নগরের জৈবিক শ্রেণিবিন্যাস (Organic Classification of Cities)। তিনি নগর বিকাশকে মোট ৬টি পর্যায়ে বিভক্ত করেন। প্রথম তিনটি পর্যায় নগরের উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রতীক এবং শেষ তিনটি পর্যায় নগরের অবক্ষয় ও পতনের প্রতীক।
লুইস মামফোর্ডের নগর বিকাশের ৬টি পর্যায় (Six Stages of Urban Development)
ইওপোলিস হলো নগর সভ্যতার একেবারে প্রাথমিক বা শৈশব পর্যায়। যখন মানুষ যাযাবর জীবন ত্যাগ করে স্থায়ীভাবে কৃষিভিত্তিক বসতি স্থাপন করতে শুরু করে এবং ছোট বাজার, ধর্মীয় কেন্দ্র ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে একটি স্থায়ী জনবসতি গড়ে ওঠে, তখন তাকে ইওপোলিস বলা হয়। এটি মূলত গ্রাম ও শহরের মধ্যবর্তী একটি প্রাথমিক নগর রূপ।
বৈশিষ্ট্য (Characteristics)
- মানুষের প্রধান জীবিকা ছিল কৃষিকাজ, পশুপালন ও মাছ ধরা।
- জনসংখ্যা কম ছিল এবং সামাজিক ঐক্য অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল।
- ধর্মীয় কেন্দ্র ও ছোট বাজারকে কেন্দ্র করে বসতি গড়ে উঠত।
ইওপোলিস পর্যায়ের বসতিগুলোর মধ্যে যখন বাণিজ্যিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পায় এবং বাজারকেন্দ্রিক নগর জীবনের সূচনা হয়, তখন সেই উন্নত নগর পর্যায়কে পোলিস বলা হয়। এটি নগর জীবনের একটি সংগঠিত ও উন্নত ধাপ যেখানে অর্থনৈতিক কার্যকলাপ দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
বৈশিষ্ট্য (Characteristics)
- খুচরা ও পাইকারি ব্যবসার দ্রুত বিকাশ ঘটে।
- হস্তশিল্প ও কারিগরি শিল্পের উন্নতি দেখা যায়।
- ব্যবসায়ী শ্রেণি ও সামাজিক স্তরবিন্যাসের উদ্ভব হয়।
মেট্রোপোলিস হলো নগরের বিকাশের সর্বোচ্চ ও সর্বাধিক উন্নত পর্যায়। যখন একাধিক ছোট শহর ও গ্রাম একটি বৃহৎ শহরকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সংযুক্ত হয়, তখন সেই বৃহৎ নগরকে মেট্রোপোলিস বলা হয়। এটি একটি দেশের প্রধান অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে।
বৈশিষ্ট্য (Characteristics)
- শিল্প, বাণিজ্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ব্যাপক উন্নতি ঘটে।
- উন্নত যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
- শ্রমের বিশেষীকরণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি ঘটে।
মেট্রোপোলিস পর্যন্ত নগরের উত্থান ও সমৃদ্ধি ঘটে। এর পরবর্তী পর্যায়গুলো নগরের অবক্ষয়ের প্রতীক।
যখন একটি মেট্রোপোলিস অত্যধিক জনসংখ্যা ও নগরায়ণের চাপে দ্রুত সম্প্রসারিত হয়ে পার্শ্ববর্তী ছোট শহর, উপনগর ও নগর অঞ্চলগুলোর সঙ্গে একত্রিত হয়ে একটি বিশাল ধারাবাহিক নগর অঞ্চলে পরিণত হয়, তখন তাকে মেগালোপোলিস বলা হয়। এই পর্যায়ে নগরের আয়তন, জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক কার্যকলাপ অত্যন্ত বৃদ্ধি পায় এবং বিভিন্ন সামাজিক ও পরিবেশগত সমস্যার সৃষ্টি হয়।
বৈশিষ্ট্য (Characteristics)
- জনসংখ্যার অত্যধিক বৃদ্ধি ও আবাসন সংকট দেখা দেয়।
- যানজট, দূষণ ও পরিবেশগত সমস্যা বৃদ্ধি পায়।
- সামাজিক সংহতি দুর্বল হয়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি পায়।
টাইরানোপোলিস হলো নগরের অবক্ষয়ের এমন একটি পর্যায় যেখানে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা কিছু ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে। সমাজে বৈষম্য, শোষণ, দূষণ ও বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পায় এবং নগর জীবন ধীরে ধীরে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।
বৈশিষ্ট্য (Characteristics)
- পরিবেশ দূষণ ও সামাজিক অবক্ষয় চরম আকার ধারণ করে।
- বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও অপরাধ বৃদ্ধি পায়।
- নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে।
নেক্রোপোলিস হলো নগরের বিবর্তনের শেষ ও ধ্বংসপ্রাপ্ত পর্যায়। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, মহামারী, প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংকটের কারণে যখন একটি সমৃদ্ধ নগর ধীরে ধীরে জনশূন্য ও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়, তখন তাকে নেক্রোপোলিস বলা হয়। এটি নগরের মৃত্যু ও পতনের প্রতীক।
বৈশিষ্ট্য (Characteristics)
- শহর জনশূন্য হয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
- সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কার্যকলাপ বন্ধ হয়ে যায়।
- যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও মহামারীর প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
সারসংক্ষেপ সারণী (Summary Table)
| পর্যায় | নগরের নাম | মূল বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|
| ১ | ইওপোলিস (Eopolis) | কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ বসতি |
| ২ | পোলিস (Polis) | ক্ষুদ্র বাণিজ্যিক শহর |
| ৩ | মেট্রোপোলিস (Metropolis) | উন্নত মহানগর |
| ৪ | মেগালোপোলিস (Megalopolis) | অতিজনবহুল মহানগর |
| ৫ | টাইরানোপোলিস (Tyrannopolis) | অবক্ষয় ও দূষণপূর্ণ নগর |
| ৬ | নেক্রোপোলিস (Necropolis) | মৃত বা ধ্বংসপ্রাপ্ত নগর |
উপসংহার (Conclusion)
লুইস মামফোর্ড নগর বিকাশকে একটি জৈবিক ও বিবর্তনমূলক প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর এই শ্রেণিবিন্যাস নগরের জন্ম, বিকাশ, সমৃদ্ধি, অবক্ষয় ও পতনের ধারাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। আধুনিক নগর সমাজতত্ত্ব ও নগর ভূগোলে তাঁর তত্ত্বের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে এবং আধুনিক নগরায়ণের সমস্যা বোঝার ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
"""
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন