অ্যালেন প্রেড-এর আচরণগত ম্যাট্রিক্স ও শিল্পের অবস্থান তত্ত্ব
(Allen Pred's Behavioral Matrix and Industrial Location Theory, 1967)
মার্কিন অর্থনৈতিক ভূগোলবিদ অ্যালেন প্রেড ১৯৬৭ সালে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'Behavior and Location'-এ এই তত্ত্বটি উপস্থাপন করেন। তিনি আলফ্রেড ওয়েবার বা অগাস্ট লশের ধ্রুপদী তত্ত্বগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেন যে, শিল্পোদ্যোক্তারা সর্বদা 'অর্থনৈতিক মানব' (Economic Man) হিসেবে সম্পূর্ণ যুক্তিবাদী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। বরং মানুষের সীমাবদ্ধ ক্ষমতা, অসম্পূর্ণ তথ্য এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা শিল্পের অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রেড তাঁর তত্ত্বে হার্বার্ট সাইমনের 'সীমাবদ্ধ যুক্তিবাদ' (Bounded Rationality) ধারণাকে ব্যবহার করেন এবং দেখান যে অধিকাংশ শিল্পোদ্যোক্তা সর্বোত্তম (Optimal) অবস্থানের পরিবর্তে সন্তোষজনক (Satisficing) অবস্থানে শিল্প স্থাপন করেন।
১. মূল ধারণা (Central Concept)
প্রেড-এর মতে, কোনো শিল্পের অবস্থান কেবল পরিবহন খরচ, বাজার বা কাঁচামালের ওপর নির্ভর করে না; বরং এটি প্রধানত দুটির বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল:
- তথ্যের পরিমাণ ও গুণমান (Quantity and Quality of Information): শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য কতটা পাওয়া যাচ্ছে এবং সেই তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য।
- তথ্য ব্যবহারের ক্ষমতা (Ability to Use Information): উদ্যোক্তার শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা।
২. আচরণগত ম্যাট্রিক্স (The Behavioral Matrix)
প্রেড তাঁর তত্ত্বটিকে একটি দ্বিমাত্রিক ছক বা ম্যাট্রিক্সের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন।
- X-অক্ষ (অনুভূমিক): এখানে তথ্যের পরিমাণ ও গুণমান দেখানো হয়। বাম দিক থেকে ডান দিকে গেলে তথ্যের পরিমাণ ও মান বৃদ্ধি পায়।
- Y-অক্ষ (উল্লম্ব): এখানে তথ্য ব্যবহারের ক্ষমতা দেখানো হয়। নিচ থেকে ওপরের দিকে গেলে উদ্যোক্তার দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
ম্যাট্রিক্সের ব্যাখ্যা
- B11 কোষ: এখানে তথ্য এবং দক্ষতা উভয়ই খুব কম। ফলে এই অবস্থানে স্থাপিত শিল্প ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল থাকে। একে ব্যর্থ অঞ্চল (Failure Zone) বলা হয়।
- Bnn কোষ: এখানে তথ্যের প্রাচুর্য এবং তথ্য ব্যবহারের ক্ষমতা দুই-ই সর্বোচ্চ। এটি তাত্ত্বিকভাবে সবচেয়ে আদর্শ বা লাভজনক অবস্থান (Optimal Location)।
অধিকাংশ শিল্পই এই দুই চরম সীমার মাঝামাঝি কোনো সন্তোষজনক বা সাব-অপ্টিমাল (Sub-optimal but Viable) অবস্থানে গড়ে ওঠে।
৩. গতিশীল প্রকৃতি (Dynamic Nature)
প্রেডের তত্ত্বটি স্থির নয়; এটি একটি গতিশীল তত্ত্ব।
- সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উদ্যোক্তার অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি পেলে তথ্য ব্যবহারের দক্ষতা (Y-অক্ষ) বৃদ্ধি পায়।
- নতুন বাজার গবেষণা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তথ্যের পরিমাণ ও গুণমান (X-অক্ষ) বৃদ্ধি পায়।
এর ফলে একটি শুরুতে ঝুঁকিপূর্ণ বা অলাভজনক শিল্পও ধীরে ধীরে লাভজনক বা আদর্শ অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হতে পারে।
৪. তথ্যের স্থানিক পক্ষপাত (Spatial Bias in Information)
প্রেড লক্ষ্য করেন যে তথ্য সব জায়গায় সমানভাবে পাওয়া যায় না।
- শিল্পোদ্যোক্তারা সাধারণত তাদের পরিচিত এলাকা বা 'হোম বেস' সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি তথ্য রাখেন।
- দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তথ্যের গুণমান কমতে থাকে। ফলে নতুন শিল্প সাধারণত পূর্বপরিচিত বা আগে থেকেই শিল্পোন্নত অঞ্চলে গড়ে ওঠে।
৫. ক্রমপুঞ্জিত কারণতত্ত্ব (Cumulative Causation)
প্রেড দেখান যে যেখানে শিল্প গড়ে ওঠে, সেখানে তথ্যের আদান-প্রদান, দক্ষ শ্রমিক এবং অবকাঠামোর উন্নয়ন বৃদ্ধি পায়। এর ফলে নতুন শিল্প সেই অঞ্চলেই আকৃষ্ট হয়। যেমন - সিলিকন ভ্যালি বা ভারতের বেঙ্গালুরু। এই প্রক্রিয়া আঞ্চলিক বৈষম্য সৃষ্টি করতে পারে।
৬. বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা (Contemporary Relevance)
- বিগ ডাটা ও এআই (Big Data and AI): বর্তমানে Amazon বা Alibaba-এর মতো সংস্থাগুলো উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে তথ্য বিশ্লেষণ করে লাভজনক অবস্থান নির্ণয় করছে।
- বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ): সরকার শিল্পোদ্যোক্তাদের তথ্য ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করে শিল্পের অবস্থান উন্নত করতে সাহায্য করছে।
৭. সমালোচনা (Critiques)
- এই তত্ত্বে তথ্য বা দক্ষতা পরিমাপ করার কোনো নির্দিষ্ট গাণিতিক পদ্ধতি নেই।
- এটি শিল্প স্থাপনের পূর্বাভাস দেওয়ার তুলনায় স্থাপনের পরের কারণ ব্যাখ্যায় বেশি কার্যকর।
- পরিবহন ব্যয়, শ্রম খরচ বা অন্যান্য অর্থনৈতিক বিষয়কে এখানে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
- আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তথ্যের স্থানিক সীমাবদ্ধতা আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে।
উপসংহার (Conclusion)
পরিশেষে বলা যায়, অ্যালেন প্রেডের শিল্পের অবস্থান তত্ত্ব শিল্পভূগোলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে। এই তত্ত্বে কেবল লাভ-ক্ষতির অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ নয়, বরং মানুষের আচরণ, সীমিত যৌক্তিকতা, তথ্যের প্রাপ্যতা এবং অভিজ্ঞতার গুরুত্বকে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বর্তমান তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে এই তত্ত্বের গুরুত্ব আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন