পশ্চিমবঙ্গের ভূ-প্রাকৃতিক বিভাগ
(Physiographic Division of West Bengal)
১. পশ্চিমবঙ্গের ভূ-প্রাকৃতিক বিভাগ
ভূমিকা
পশ্চিমবঙ্গের ভূপ্রকৃতিতে বৈচিত্র্যময়। এখানে উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত উচ্চ পর্বত, পাহাড়, মালভূমি, সমতলভূমি, প্রাবনভূমি ও ব-দ্বীপ অঞ্চল ক্রমশ বিস্তৃত। এই ভূপ্রকৃতির গঠন, উচ্চতা, ভৌত ইতিহাস ও ভৌগোলিক প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গকে ভূ-প্রাকৃতিকভাবে ৮টি প্রধান বিভাগে ভাগ করা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের ভূ-প্রাকৃতিক ৮টি বিভাগ
১. হিমালয় অঞ্চল (উত্তর-পশ্চিম)
২. তরাই অঞ্চল
৩. উত্তরবঙ্গের সমতলভূমি
৪. রাঢ় অঞ্চল
৫. উপকূলীয় সমতলভূমি
৬. সুন্দরবন
৭. পশ্চিমবঙ্গের প্রাবনভূমি এবং উচ্চভূমি
৮. গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ
N.B.
উত্তর দিনাজপুর সমতলভূমি থেকে—
মহানন্দা সমতলভূমি →
দক্ষিণ দিনাজপুর সমতলভূমি →
বরিন্দ সমতলভূমি →
বীরভূম সমতলভূমি →
বীরভূম মাটির অঞ্চল →
ময়ূরাক্ষী সমতলভূমি →
পূর্ব ভাগীরথী সমতলভূমি →
পশ্চিম মেদিনীপুর সমতলভূমি →
কাঁসাই-উপত্যকা →
পূর্ব মেদিনীপুর সমতলভূমি →
কাঁথি সমতলভূমি।
ভূপৃষ্ঠের প্রধান উপাদানসমূহ
মাটি: বিভিন্ন প্রকার—অলিউভিয়াল, ল্যাটেরাইট, লাল-দোআঁশ, বেলে মাটি ইত্যাদি।
উচ্চতা: ০ মি. (ব-দ্বীপ অঞ্চল) থেকে ৮৫৮৬ মি. (কাঞ্চনজঙ্ঘা) পর্যন্ত।
ঢাল: উত্তর (পাহাড় ও হিমালয়) থেকে দক্ষিণ (সমতল) দিকে সাধারণত ঢালু।
প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য: পাহাড়, নদী, সমতল, বনাঞ্চল, জলাভূমি, ব-দ্বীপ ইত্যাদি।
গাঠনিক ইতিহাস: ভূ-প্রাকৃতিক গঠন ও ভৌগোলিক প্রক্রিয়ার ফলস্বরূপ এই বৈচিত্র্য সৃষ্টি হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
পশ্চিমবঙ্গের ভূপ্রকৃতির এই বৈচিত্র্য জলবায়ু, মাটি, উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলের সৃষ্টি করেছে এবং মানুষের জীবন-যাত্রা, কৃষি, শিল্প, পরিবহন ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেছে।
২. হিমালয় অঞ্চল (উত্তর-পশ্চিম)
অবস্থিতি
এই অঞ্চলটি পশ্চিমবঙ্গের সর্বোত্তরের অংশে অবস্থিত। দার্জিলিং জেলা পুরোপুরি এবং কালিম্পং জেলার কিছু অংশ এই অঞ্চলে পড়ে।
প্রধান ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য
- উচ্চতা ৩০০০ মিটার থেকে ৮৫৮৬ মিটার পর্যন্ত (কাঞ্চনজঙ্ঘা শৃঙ্গ)।
- এখানে তুষারাবৃত শৃঙ্গ, গভীর উপত্যকা, খাড়া ঢাল ও হিমবাহ দেখা যায়।
- পর্বতশ্রেণী: মহাকাল, সিঙ্গালিলা, চোরেটাং, তেনচেংখাং প্রভৃতি।
- প্রধান শৃঙ্গ: কাঞ্চনজঙ্ঘা (৮৫৮৬ মি.), জোংরি, পান্ডিম, সিমভো প্রভৃতি।
- প্রধান স্থান: দার্জিলিং, কালিম্পং, কার্শিয়াং, লাভা-লোলেগাঁও, সান্দাকফু, রিশ্যপ, মিরিক প্রভৃতি।
- জলবায়ু: শীতপ্রধান, শীতকালে তুষারপাত হয়, গ্রীষ্ম শীতল ও মনোরম।
- উদ্ভিদ: শঙ্কুযুক্ত বন (পাইন, দেবদারু, সিলভার ফার), রোডোডেনড্রন, অর্কিড ইত্যাদি।
- অর্থনীতি: চা-চাষ, পর্যটন, ফল (কমলা, এলাচ), বনজ সম্পদ, পশুপালন।
৩. তরাই অঞ্চল
অবস্থিতি
হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত সংকীর্ণ সমতল ভূমি। দার্জিলিং এবং জলপাইগুড়ি জেলার উত্তরাংশ জুড়ে বিস্তৃত।
প্রধান বৈশিষ্ট্য
- হিমালয় ও দোয়ার্সের মধ্যবর্তী স্থলভাগ।
- অসংখ্য নদ-নদী, জলাভূমি ও বনাঞ্চল সমৃদ্ধ।
- প্রধান নদী: মহানন্দা, তিস্তা, জলঢাকা, ধরলা, রায়ডাক, জলঢাকা প্রভৃতি।
- মাটি: দো-আঁশ মাটি, উর্বর।
- ঘন বন: শাল, সেগুন, বাঁশ, ঝাউ, শিমুল প্রভৃতি।
- প্রধান স্থান: শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, মালবাজার, মেখলিগঞ্জ, মাথাভাঙ্গা প্রভৃতি।
- অর্থনীতি: চাষাবাদ (ধান, পাট, আখ), চা-বাগান, বনজ সম্পদ, মৎস্যচাষ।
৪. উত্তরবঙ্গের সমতলভূমি
অবস্থিতি
তরাই-এর দক্ষিণে অবস্থিত বিস্তৃত সমতল ভূমি। জলপাইগুড়ি, কোচবিহার ও উত্তর দিনাজপুর জেলার অধিকাংশ অংশ এই অঞ্চলে পড়ে।
প্রধান বৈশিষ্ট্য
- এখানে নদ-নদী, বিল, জলাভূমি ও পলি-মাটি দ্বারা গঠিত সমভূমি বিস্তৃত।
- প্রধান নদী: তিস্তা, জলঢাকা, ধরলা, রায়ডাক, তোর্ষা, কালজানী প্রভৃতি।
- মাটি: পলিমাটি, দো-আঁশ মাটি—অত্যন্ত উর্বর।
- অঞ্চলে ছোট ছোট বিল, হাওড়, জলাভূমি প্রচুর পরিমাণে দেখা যায়।
- প্রধান স্থান: কোচবিহার, দিনহাটা, তুফানগঞ্জ, ইসলামপুর, রায়গঞ্জ প্রভৃতি।
- অর্থনীতি: কৃষি (ধান, পাট, কলাই, গম, সরিষা), মৎস্যচাষ, রেশমচাষ, দুগ্ধ উৎপাদন।
৫. রাঢ় অঞ্চল
অবস্থিতি
দামোদর, অজয় ও ময়ূরাক্ষী নদী দ্বারা গঠিত প্রাচীন প্রাবনভূমি।
প্রধান বৈশিষ্ট্য
- বীরভূম, বর্ধমান, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, পশ্চিম মেদিনীপুরের পশ্চিম অংশ এই অঞ্চলে পড়ে।
- মাটি: লালমাটি (লেটারাইট), দো-আঁশ মাটি।
- ভূপ্রকৃতি: ঢেউখেলানো ভূমি, ছোট পাহাড় (অযোধ্যা পাহাড়, পাঞ্চেত পাহাড়) দেখা যায়।
- জলপ্রবাহ: দামোদর, অজয়, ময়ূরাক্ষী, কংসাবতী প্রভৃতি নদী।
- অর্থনীতি: কৃষি (ধান, আলু, ডাল, তেলবীজ), খনিজ সম্পদ (কয়লা, লৌহ আকরিক), মৃত্শিল্প, তাঁতশিল্প।
৬. উপকূলীয় সমতলভূমি
অবস্থিতি
রাঢ় অঞ্চলের পূর্বে অবস্থিত নিচু ও সমতল এলাকা। হুগলি, হাওড়া, কলকাতা, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা এই অঞ্চলে পড়ে।
প্রধান বৈশিষ্ট্য
- এটি একটি নিম্নভূমি সমতলভূমি।
- গড় উচ্চতা ১০ মিটারের কম।
- সর্বত্র পলিমাটি দ্বারা গঠিত।
- সুন্দরবনের একাংশ এই অঞ্চলে অবস্থিত।
- প্রচুর নদ-নদী, খাল-বিল, হ্রদ ও জলাভূমি আছে।
- ধান, পাট, সবজি, মাছ চাষ এই অঞ্চলের প্রধান জীবিকা।
প্রধান স্থান
কলকাতা, বারুইপুর, বসিরহাট, ডায়মন্ড হারবার, মথুরাপুর, কাকদ্বীপ, সাগরদ্বীপ।
অর্থনীতি
কৃষি (ধান, পাট, সবজি), মৎস্যচাষ, নৌপরিবহন, লবণ উৎপাদন, পোশাক, ক্ষুদ্র শিল্প।
৭. সুন্দরবন
অবস্থিতি
গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদীবিধৌত দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে গঠিত বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার দক্ষিণাংশ ও সুন্দরবনের একাংশ এই অঞ্চলে পড়ে।
প্রধান বৈশিষ্ট্য
- এটি বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপীয় ম্যানগ্রোভ বন।
- আয়তন প্রায় ১০,০০০ বর্গকিমি (ভারত অংশে প্রায় ৪,২৬৩ বর্গকিমি)।
- অসংখ্য নদী, খাঁড়ি, জলাভূমি ও নোনা জলের জঙ্গল দ্বারা গঠিত।
- রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, কুমির, বনশূকর ইত্যাদি প্রাণীর আবাস।
- প্রধান স্থান: গোসাবা, বসিরহাট, কাকদ্বীপ, সাগরদ্বীপ, নামখানা।
- অর্থনীতি: মৎস্যচাষ, কাঁকড়া চাষ, মধু সংগ্রহ, কাঠ সংগ্রহ, পর্যটন।
৮. পশ্চিমবঙ্গের প্রাবনভূমি এবং উচ্চভূমি
অবস্থিতি
সুন্দরবনের পূর্বে অবস্থিত গঙ্গার ব-দ্বীপের নিচু প্রাবনভূমি জমি এবং কিছু উঁচু দ্বীপ ও টিলা নিয়ে গঠিত।
প্রধান বৈশিষ্ট্য
- প্রাবনভূমি জমি মূলত নিচু ও সমতল।
- নদীর পলি দ্বারা গঠিত।
- কিছু কিছু স্থানে বালির চরের উপর উঁচু দ্বীপ ও টিলা আছে।
প্রধান স্থান
গঙ্গার চর অঞ্চল ইত্যাদি।
অর্থনীতি
কৃষি (ধান, পাট), ফল চাষ, সবজি চাষ, রবিশস্য চাষ, নৌ চলাচল।
৯. গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ
অবস্থিতি
গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর পলিতে গঠিত বিশাল ব-দ্বীপ অঞ্চল। পূর্ব ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার সমুদ্রতটবর্তী অংশ এবং বঙ্গোপসাগর উপকূল এই বিভাগের অন্তর্ভুক্ত।
প্রধান বৈশিষ্ট্য
- এটি বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ।
- বহু শাখা-প্রশাখা নদী ও নালার জালিকা রয়েছে।
- পলি সঞ্চয়ের ফলে ভূমির ক্রমাগত পরিবর্তন ঘটে।
- জোয়ার-ভাটার প্রভাব প্রবল।
- প্রধান স্থান: ফ্রেজারগঞ্জ, সাগরদ্বীপ, নামখানা, কাকদ্বীপ, পাথরপ্রতিমা, রায়দিঘি।
- অর্থনীতি: মৎস্যচাষ, লবণ উৎপাদন, চিংড়ি চাষ, কৃষি, পর্যটন, নৌপরিবহন।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
পশ্চিমবঙ্গের ভূ-প্রাকৃতিক বিভাগ আমাদের রাজ্যের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, মাটি, নদ-নদী, জলবায়ু, উদ্ভিদ ও প্রাণীকুল এবং মানুষের জীবন-জীবিকার উপর গভীর প্রভাব ফেলে।
পশ্চিমবঙ্গের জলবায়ু
ভূমিকা
পশ্চিমবঙ্গের জলবায়ু প্রধানত উষ্ণমণ্ডলীয় মৌসুমি জলবায়ু। তবে সমগ্র রাজ্যে একই ধরনের জলবায়ু দেখা যায় না। উত্তরে দার্জিলিং ও হিমালয় সংলগ্ন পার্বত্য অঞ্চলে উচ্চতার প্রভাবে অপেক্ষাকৃত শীতল জলবায়ু, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের প্রভাবে উষ্ণ ও আর্দ্র সামুদ্রিক জলবায়ু এবং পশ্চিমের মালভূমি অঞ্চলে তুলনামূলক শুষ্ক ও চরমভাবাপন্ন জলবায়ু দেখা যায়।
পশ্চিমবঙ্গের উত্তরে হিমালয় পর্বতমালা এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর অবস্থিত। ফলে একদিকে হিমালয় শীতল বায়ুর প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করে, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগর থেকে আগত আর্দ্র মৌসুমি বায়ু রাজ্যে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়।
এই পৃষ্ঠায় যা যা থাকছে
১. পশ্চিমবঙ্গের জলবায়ুর সাধারণ বৈশিষ্ট্য
২. জলবায়ুকে প্রভাবিতকারী প্রধান কারণসমূহ
৩. পশ্চিমবঙ্গের জলবায়ুর ঋতুভাগ
৪. গ্রীষ্মকাল
৫. বর্ষাকাল / দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু
৬. বৃষ্টিপাতের আঞ্চলিক বৈচিত্র্য
৭. সর্বাধিক ও সর্বনিম্ন বৃষ্টিপাত অঞ্চল
৮. প্রত্যাবর্তনশীল মৌসুমি বায়ু
৯. শীতকাল
১০. জলবায়ু অঞ্চল (সংক্ষেপে)
১. পশ্চিমবঙ্গের জলবায়ুর সাধারণ বৈশিষ্ট্য
- পশ্চিমবঙ্গের জলবায়ু প্রধানত উষ্ণমণ্ডলীয় মৌসুমি প্রকৃতির।
- উত্তরে পার্বত্য অঞ্চল, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর এবং পশ্চিমে মালভূমি অঞ্চল—এই ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের কারণে জলবায়ুতেও বৈচিত্র্য দেখা যায়।
- বার্ষিক বৃষ্টিপাতের অধিকাংশ অংশ (প্রায় ৭৫–৯০%) জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে হয়।
- গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা বেশি এবং শীতকালে তাপমাত্রা কম। তবে সমগ্র রাজ্যে একই রকম নয়।
- আর্দ্রতা, বৃষ্টি, তাপমাত্রা এবং বাতাসের প্রবাহ—এই চারটি উপাদান এখানে জলবায়ুকে নির্ধারণ করে।
- পশ্চিমবঙ্গের গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাত প্রায় ১৭৫–১৮৩ সেমি (আনুমানিক)।
মনে রাখার সহজ সূত্র
উত্তরে হিমালয় → শীতল প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করে।
দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর → আর্দ্র মৌসুমি বায়ু ও বেশি বৃষ্টি ঘটায়।
২. জলবায়ুকে প্রভাবিতকারী প্রধান কারণসমূহ
পশ্চিমবঙ্গের জলবায়ু নানা ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক কারণের দ্বারা প্রভাবিত। প্রধান কারণগুলি নিচে আলোচনা করা হলো।
১. ভৌগোলিক অবস্থান
- পশ্চিমবঙ্গ ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাংশে অবস্থিত।
- এর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, উত্তরে হিমালয় পর্বতমালা এবং পশ্চিমে মালভূমি অঞ্চল রয়েছে।
- এই অবস্থানের জন্য বঙ্গোপসাগরীয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাব রাজ্যের জলবায়ুতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২. কর্কটক্রান্তি রেখা
- কর্কটক্রান্তি রেখা পশ্চিমবঙ্গের মধ্যভাগের কাছ দিয়ে অতিক্রম করেছে।
- এটি নদিয়া ও বর্ধমান অঞ্চলের মধ্য দিয়ে এবং বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ার উত্তরাংশের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে।
- ফলে অক্ষাংশগত অবস্থানের জন্য রাজ্যের বিভিন্ন অংশে উষ্ণতার তারতম্য দেখা যায়।
৩. হিমালয়ের প্রভাব
- উত্তরে হিমালয় পর্বতমালা অবস্থিত হওয়ায় উত্তর দিক থেকে আগত শীতল বায়ুর প্রভাব অনেকটাই বাধাপ্রাপ্ত হয়।
- হিমালয়ের পার্বত্য ঢালে বায়ু বাধাপ্রাপ্ত হয়ে উপরে উঠে শীতল হয় এবং ঘনীভবনের ফলে অরোগ্রাফিক বৃষ্টিপাত ঘটে।
- উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি অঞ্চলে (দার্জিলিং প্রভৃতি) তাপমাত্রা কম।
৪. বঙ্গোপসাগরের প্রভাব
- দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর অবস্থিত হওয়ায় সামুদ্রিক প্রভাব রাজ্যে প্রবল।
- সমুদ্রের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে তাপমাত্রার দৈনিক ও বার্ষিক তারতম্য কম এবং আর্দ্রতা বেশি থাকে।
- বঙ্গোপসাগর থেকেই মৌসুমি বায়ু প্রচুর জলীয়বাষ্প সংগ্রহ করে।
৫. মৌসুমি বায়ু
- পশ্চিমবঙ্গের জলবায়ুর প্রধান নিয়ন্ত্রক হলো মৌসুমি বায়ু।
- দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বঙ্গোপসাগর থেকে জলীয়বাষ্প বহন করে রাজ্যে প্রবেশ করে এবং অধিকাংশ বার্ষিক বৃষ্টিপাত ঘটায়।
- জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ সর্বাধিক।
৬. উচ্চতা
- উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা হ্রাস পায়।
- তাই দার্জিলিং ও অন্যান্য পাহাড়ি অঞ্চলে সমতলভূমির তুলনায় তাপমাত্রা অনেক কম।
- প্রতি ১০০০ মিটার উচ্চতায় তাপমাত্রা প্রায় ৬–৬.৫°C হ্রাস পায়।
৭. অরোগ্রাফিক প্রভাব
- আর্দ্র বায়ু পাহাড়ের ঢালে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে উপরে উঠে শীতল হয়।
- ফলে ঘনীভবনের মাধ্যমে বৃষ্টিপাত ঘটে।
- এই বৃষ্টিপাতকে অরোগ্রাফিক বৃষ্টিপাত বলা হয়।
সার কথা
হিমালয়, বঙ্গোপসাগর, মৌসুমি বায়ু, ভূ-প্রকৃতি ও উচ্চতা—এই সব কারণের সম্মিলিত প্রভাবে পশ্চিমবঙ্গের জলবায়ু গঠিত ও বৈচিত্র্যময়।
৩. পশ্চিমবঙ্গের জলবায়ুর ঋতুভাগ
পশ্চিমবঙ্গের জলবায়ু প্রধানত চারটি ঋতুতে বিভক্ত। এই ঋতুগুলির বৈশিষ্ট্য আলাদা এবং মানুষের জীবন, কৃষি ও অর্থনীতির উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
| ক্রমিক | ঋতু | সময়কাল | প্রধান বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|---|
| ১ | গ্রীষ্মকাল | মার্চ–জুন | উচ্চ তাপমাত্রা, শুষ্কতা, কালবৈশাখী, নিম্নচাপ সৃষ্টি |
| ২ | বর্ষাকাল / দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু | জুন–সেপ্টেম্বর | প্রচুর বৃষ্টিপাত, উচ্চ আর্দ্রতা, নিম্নচাপ ও ঘূর্ণাবর্ত |
| ৩ | প্রত্যাবর্তনশীল মৌসুমি বায়ু | সেপ্টেম্বর–অক্টোবর/নভেম্বরের প্রথম ভাগ | মৌসুমি বায়ুর প্রত্যাহার, আর্দ্রতা হ্রাস, আকাশ পরিষ্কার, ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনা |
| ৪ | শীতকাল | মধ্য নভেম্বর–মধ্য ফেব্রুয়ারি | নিম্ন তাপমাত্রা, শুষ্কতা, কুয়াশা, শিশির, পশ্চিমী ঝঞ্ঝার প্রভাবে হালকা বৃষ্টি |
১. গ্রীষ্মকাল (মার্চ–জুন)
- সূর্যের উত্তরায়ণ ও সূর্যালোকের ক্রমবর্ধমান প্রভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়।
- পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমের মালভূমি অঞ্চলে গরম ও শুষ্কতা বেশি।
- দক্ষিণবঙ্গের সমতল ও উপকূলীয় অঞ্চলে আর্দ্রতা তুলনামূলক বেশি থাকে।
- এপ্রিল–মে মাসে স্থলভাগে নিম্নচাপ বলয় সৃষ্টি হয়।
- গ্রীষ্মের শেষভাগে বজ্রবিদ্যুৎসহ আকস্মিক ঝড় ও বৃষ্টিপাত হয়, যাকে কালবৈশাখী বলা হয়।
- দৈনিক তাপমাত্রার তারতম্য বেশি।
প্রধান বৈশিষ্ট্য
- উচ্চ তাপমাত্রা
- শুষ্কতা
- নিম্নচাপ সৃষ্টি
- কালবৈশাখী ঝড়
- দৈনিক তাপমাত্রার তারতম্য বেশি
২. বর্ষাকাল / দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু (জুন–সেপ্টেম্বর)
- জুন মাসে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করে।
- বঙ্গোপসাগর থেকে প্রচুর জলীয়বাষ্প নিয়ে মৌসুমি বায়ু বৃষ্টিপাত ঘটায়।
- বার্ষিক বৃষ্টিপাতের প্রধান অংশ এই সময়ে হয় (প্রায় ৭৫%–৯০%)।
- বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি নিম্নচাপ ও ঘূর্ণাবর্তের কারণে ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে।
- নদ-নদীতে জলবৃদ্ধি হয়।
- বন্যার সম্ভাবনা থাকে।
- উত্তরবঙ্গের পাহাড় ও তরাই-ডুয়ার্স অঞ্চলে বৃষ্টিপাত সর্বাধিক।
৩. প্রত্যাবর্তনশীল মৌসুমি বায়ু
(সেপ্টেম্বর–অক্টোবর/নভেম্বরের প্রথম ভাগ)
- দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করতে শুরু করে।
- আর্দ্রতা কমতে থাকে, আকাশ পরিষ্কার হতে থাকে।
- বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হলে দক্ষিণবঙ্গ ও উপকূলীয় অঞ্চলে বৃষ্টি হতে পারে।
- দক্ষিণবঙ্গ, বিশেষত উপকূলীয় অঞ্চল, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
৪. শীতকাল
(মধ্য নভেম্বর–মধ্য ফেব্রুয়ারি)
- জানুয়ারি সাধারণত সবচেয়ে শীতল মাস।
- বৃষ্টিপাত খুব কম, আকাশ সাধারণত পরিষ্কার থাকে।
- উত্তরবঙ্গের সমতল অঞ্চলে কুয়াশা পড়ে।
- উত্তরবঙ্গের পার্বত্য অঞ্চলে তাপমাত্রা কম, কখনও তুষারপাত হতে পারে।
- উত্তর-পশ্চিম ভারতের পশ্চিমী ঝঞ্ঝার প্রভাবে উত্তরবঙ্গে হালকা বৃষ্টি হয়।
মনে রাখবে
গ্রীষ্ম → গরম ও শুষ্ক
বর্ষা → বৃষ্টি ও আর্দ্র
প্রত্যাবর্তন → বায়ুর প্রত্যাহার ও ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনা
শীত → ঠান্ডা ও শুষ্ক
৪. গ্রীষ্মকাল (মার্চ–জুন)
গ্রীষ্মকালে পশ্চিমবঙ্গের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঋতু। এই সময় সূর্যের উত্তাপের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনা ঘটে।
প্রধান বৈশিষ্ট্য
১. উচ্চ তাপমাত্রা: মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত দিনে তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। পশ্চিমের মালভূমি অঞ্চলে তাপমাত্রা বেশি হয়।
২. সর্বোচ্চ তাপমাত্রা: মে মাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৮°–৪৫°C পর্যন্ত হতে পারে (পশ্চিমের জেলাগুলিতে)।
৩. শুষ্কতা: পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমাঞ্চল (পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম বর্ধমান) শুষ্ক ও গরম থাকে।
৪. নিম্নচাপের সৃষ্টি: এপ্রিল–মে মাসে উত্তর-পশ্চিম ভারতে নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়। এর প্রভাবে গ্রীষ্মের শেষে বৃষ্টি শুরু হয়।
৫. কালবৈশাখী: গ্রীষ্মের শেষভাগে (এপ্রিল–মে) কালবৈশাখী ঝড়, বজ্রবিদ্যুৎ ও বৃষ্টিপাত হয়। এটি গ্রীষ্মকালের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
৬. দিনের দৈর্ঘ্য: গ্রীষ্মকালে দিন বড় ও রাত ছোট হয়।
৭. ঘাম ও আর্দ্রতা: দক্ষিণবঙ্গ ও উপকূলীয় অঞ্চলে আর্দ্রতা বেশি থাকে, ফলে গরম বেশি অনুভূত হয়।
গ্রীষ্মকালের ৭টি বৈশিষ্ট্য
- উচ্চ তাপমাত্রা (৩৮°–৪৫°C পর্যন্ত)
- শুষ্ক ও গরম আবহাওয়া
- নিম্নচাপের সৃষ্টি
- কালবৈশাখী ঝড়, বজ্রবিদ্যুৎ ও বৃষ্টি
- দক্ষিণবঙ্গ ও উপকূলে আর্দ্রতা বেশি
- দিন বড় ও রাত ছোট
- ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনা (বিশেষত পশ্চিমাঞ্চলে)
- কৃষিকাজের জন্য সেচের প্রয়োজন
৫. বর্ষাকাল / দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু (জুন–সেপ্টেম্বর)
পশ্চিমবঙ্গের জলবায়ুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঋতু হলো বর্ষাকাল। এই সময় দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বঙ্গোপসাগর থেকে জলীয়বাষ্প বহন করে এসে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করে এবং ব্যাপক বৃষ্টিপাত ঘটায়।
প্রধান বৈশিষ্ট্য
১. আগমন: জুন মাসের মাঝামাঝি (প্রায় ১৫ জুন) দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করে।
২. বৃষ্টিপাতের উৎস: বঙ্গোপসাগর থেকে প্রচুর পরিমাণ জলীয়বাষ্প সংগ্রহ করে মৌসুমি বায়ু স্থলভাগে এসে বৃষ্টিপাত ঘটায়।
৩. বৃষ্টিপাতের সময়কাল: জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের প্রধান সময়।
৪. বার্ষিক বৃষ্টিপাতের প্রধান অংশ: প্রায় ৭৫%–৮০% বৃষ্টিপাত এই সময়ে হয়ে থাকে।
৫. নিম্নচাপ ও ঘূর্ণাবর্ত: বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ, গভীর নিম্নচাপ ও ঘূর্ণাবর্ত সৃষ্টি হলে ভারী বৃষ্টিপাত হয়।
৬. উচ্চ আর্দ্রতা: বায়ুমণ্ডলে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকায় আর্দ্রতা বেশি থাকে।
৭. নদ-নদীর জল বৃদ্ধি: ভারী বৃষ্টির ফলে নদ-নদীর জলস্তর বৃদ্ধি পায়, বন্যার সম্ভাবনা দেখা দেয়।
৮. কৃষিকাজে গুরুত্ব: ধান ও অন্যান্য খরিফ ফসলের জন্য এই বৃষ্টিপাত অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
বর্ষাকালের বৈশিষ্ট্য
- মৌসুমি বায়ুর আগমন
- ব্যাপক বৃষ্টিপাত
- উচ্চ আর্দ্রতা
- নিম্নচাপ ও ঘূর্ণাবর্ত
- নদ-নদীর জল বৃদ্ধি
- বন্যার সম্ভাবনা
- কৃষির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৬. বৃষ্টিপাতের আঞ্চলিক বৈচিত্র্য
পশ্চিমবঙ্গের বৃষ্টিপাত সমভাবে হয় না। বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণে পার্থক্য দেখা যায়।
বৃষ্টিপাতের ক্রম (বেশি থেকে কম)
উত্তরবঙ্গের পার্বত্য অঞ্চল:
২০০–৮০০ সেমি
অত্যন্ত বেশি বৃষ্টিপাত (দার্জিলিং, কালিম্পং ইত্যাদি)।
তরাই-ডুয়ার্স অঞ্চল:
২০০–৬০০ সেমি
অধিক বৃষ্টিপাত।
গঙ্গা সমভূমি ও মধ্যবঙ্গ:
১৫০–২০০ সেমি
মাঝারি বৃষ্টিপাত।
উপকূলীয় অঞ্চল:
১৭৫–২০০ সেমি
আর্দ্র ও বৃষ্টিপাত ভালো।
পশ্চিমের মালভূমি অঞ্চল:
১০০–১২৫ সেমি
কম বৃষ্টিপাত (পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম বর্ধমান প্রভৃতি)।
মনে রাখবে
তরাই → গরম ও শুষ্ক
বর্ষা → মৌসুমি বায়ু, বৃষ্টি ও বন্যা
বৃষ্টিপাত → উত্তরবঙ্গে বেশি, পশ্চিমে কম।
৭. সর্বাধিক ও সর্বনিম্ন বৃষ্টিপাত অঞ্চল
পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের তারতম্য দেখা যায়। কোথাও বেশি, কোথাও কম বৃষ্টিপাত হয়।
সর্বাধিক বৃষ্টিপাত অঞ্চল
বক্সা-ডুয়ার্স অঞ্চল
(আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, কোচবিহারের অংশ)
- এখানে বার্ষিক বৃষ্টিপাত ২৫০–৪০০ সেমি বা তারও বেশি।
- হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত হওয়ায় অরোগ্রাফিক বৃষ্টিপাতের প্রভাব বেশি।
- ঘন বনভূমি ও আর্দ্র আবহাওয়ার জন্য এই অঞ্চলে বেশি বৃষ্টি হয়।
সর্বনিম্ন বৃষ্টিপাত অঞ্চল
পুরুলিয়া অঞ্চল
(পুরুলিয়া জেলার বিশেষ করে পশ্চিমাংশ)
- এখানে বার্ষিক বৃষ্টিপাত ১০০–১২৫ সেমি বা তারও কম।
- পশ্চিমের মালভূমি, কম উচ্চতা ও সমুদ্র থেকে দূরে অবস্থিত হওয়ায় কম বৃষ্টি হয়।
- শুষ্ক ও উষ্ণ আবহাওয়ার জন্য এ অঞ্চল খরাপ্রবণ।
৮. প্রত্যাবর্তনশীল মৌসুমি বায়ু
বর্ষাকাল শেষে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পশ্চাদপসরণ করতে থাকে। এই সময়কে প্রত্যাবর্তনশীল মৌসুমি বায়ুর ঋতু বলা হয়।
প্রধান বৈশিষ্ট্য
১. সময়কাল: সাধারণত সেপ্টেম্বর মাস থেকে অক্টোবর/নভেম্বরের প্রথম ভাগ পর্যন্ত।
২. বায়ুর প্রকৃতি: দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যায় এবং উত্তর-পূর্ব দিক থেকে শুষ্ক বায়ুর প্রভাব বাড়তে থাকে।
৩. আর্দ্রতা: আর্দ্রতা ধীরে ধীরে কমে যেতে থাকে।
৪. বৃষ্টিপাত: এই সময় বৃষ্টিপাত কমে যায়; তবে বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ, গভীর নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হলে দক্ষিণবঙ্গ ও উপকূলীয় অঞ্চলে বৃষ্টি হতে পারে।
৫. আকাশের অবস্থা: আকাশ তুলনামূলক পরিষ্কার হতে থাকে।
৬. তাপমাত্রা: দিনের তাপমাত্রা একটু হ্রাস পেতে শুরু করে, রাতের তাপমাত্রা ক্রমে কমতে থাকে।
৭. প্রভাব: উপকূলীয় পশ্চিমবঙ্গ এই সময় ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সংক্ষেপে মনে রাখবে
- মৌসুমি বায়ুর প্রত্যাহার শুরু হয়।
- আর্দ্রতা কমে যায়, আকাশ পরিষ্কার হয়।
- নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড় হলে বৃষ্টি হতে পারে।
- সময়কাল: সেপ্টেম্বর–অক্টোবর/নভেম্বরের প্রথম ভাগ।
৯. শীতকাল
শীতকাল পশ্চিমবঙ্গে শীতল, শুষ্ক ও মনোরম ঋতু। এই সময়ে বৃষ্টিপাত খুব কম হয় এবং আকাশ সাধারণত পরিষ্কার থাকে।
প্রধান বৈশিষ্ট্য
১. সময়কাল: সাধারণত মধ্য নভেম্বর থেকে মধ্য ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
২. তাপমাত্রা: জানুয়ারি মাস সাধারণত সবচেয়ে শীতল মাস। উত্তর পার্বত্য অঞ্চলে তাপমাত্রা অনেক কমে যায়।
৩. বৃষ্টিপাত: বৃষ্টিপাত খুব কম হয়। উত্তর-পশ্চিম ভারতের পশ্চিমী ঝঞ্ঝার প্রভাবে উত্তরবঙ্গের কিছু অংশে সামান্য বৃষ্টি হতে পারে।
৪. আকাশ: আকাশ সাধারণত পরিষ্কার থাকে।
৫. কুয়াশা: উত্তরবঙ্গের সমতল এলাকায় সকালে কুয়াশা পড়ে।
৬. পাহাড়ি অঞ্চল: দার্জিলিং ও অন্যান্য উচ্চ পার্বত্য এলাকায় প্রচণ্ড শীত পড়ে এবং কখনও কখনও তুষারপাত হয়।
৭. কৃষি: কৃষিক্ষেত্রে রবি ফসলের জন্য উপযোগী সময়।
৮. বাতাস: উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে শীতল ও শুষ্ক বায়ু প্রবাহিত হয়।
শীতকালের প্রভাব
- কৃষিক্ষেত্রে রবি ফসলের জন্য উপযোগী সময়।
- পর্যটনের দিক থেকে উত্তরবঙ্গ এই সময় জনপ্রিয়।
- শীতকালে স্বাস্থ্য সমস্যা (সর্দি, কাশি) বাড়তে পারে।
- তাপমাত্রা কম থাকায় জনজীবনে শীত অনুভূত হয়।
মনে রাখবে
গ্রীষ্ম → গরম ও শুষ্ক
বর্ষা → বৃষ্টি ও আর্দ্র
প্রত্যাবর্তনশীল ঋতু → মৌসুমি বায়ু প্রত্যাহার
শীত → ঠান্ডা ও শুষ্ক।
১০. জলবায়ু অঞ্চল (সংক্ষেপে)
পশ্চিমবঙ্গের ভূপ্রকৃতি, উচ্চতা, বৃষ্টিপাত ও সমুদ্রের প্রভাবের তারতম্যের কারণে এখানে বিভিন্ন জলবায়ু অঞ্চল দেখা যায়।
১. উত্তর পার্বত্য অঞ্চল
(দার্জিলিং ও হিমালয় অঞ্চল)
- উচ্চতা বেশি, তাপমাত্রা কম।
- বৃষ্টিপাত খুব বেশি (অরোগ্রাফিক বৃষ্টির প্রভাব)।
- শীতকালে তুষারপাত হয়।
২. তরাই-ডুয়ার্স অঞ্চল
(হিমালয়ের পাদদেশ)
- আর্দ্র ও অতিবৃষ্টিপ্রবণ এলাকা।
- ঘন বন, চা-বাগান ও নদ-নদীর আধিক্য।
৩. উত্তরবঙ্গের সমভূমি অঞ্চল
(জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, উত্তর দিনাজপুর, মালদা)
- আর্দ্র মৌসুমি জলবায়ু।
- বৃষ্টিপাত তুলনামূলকভাবে বেশি।
৪. গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চল
(মধ্য ও দক্ষিণবঙ্গের বিস্তৃত অংশ)
- উষ্ণ ও আর্দ্র মৌসুমি জলবায়ু।
- বর্ষাকালে প্রচুর বৃষ্টিপাত।
- কৃষির জন্য অনুকূল জলবায়ু।
৫. পশ্চিমের মালভূমি অঞ্চল
(পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বীরভূম, পশ্চিম বর্ধমানের অংশ)
- বৃষ্টিপাত কম, শুষ্কতা বেশি।
- গ্রীষ্মে তাপমাত্রা বেশি, শীতে শুষ্ক ও শীতল।
- খরার প্রবণতা বেশি।
৬. উপকূলীয় অঞ্চল
(পূর্ব মেদিনীপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও সংলগ্ন এলাকা)
- বঙ্গোপসাগরের প্রভাব প্রবল।
- আর্দ্রতা বেশি এবং তাপমাত্রার পার্থক্য কম।
- ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের প্রভাব পড়ে।
১১. সমুদ্রের প্রভাব
দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর অবস্থিত হওয়ায় পশ্চিমবঙ্গের জলবায়ুতে সমুদ্রের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সমুদ্রের প্রধান প্রভাব
১. তাপমাত্রার তারতম্য কমায়, জলবায়ু সমভাবাপন্ন করে।
২. বায়ুতে আর্দ্রতা বৃদ্ধি করে।
৩. মৌসুমি বায়ুকে জলীয়বাষ্প সরবরাহ করে।
৪. বর্ষাকালে বৃষ্টিপাত ঘটাতে সাহায্য করে।
৫. বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ ও ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়ে উপকূলীয় অঞ্চলের আবহাওয়াকে প্রভাবিত করে।
সমুদ্র থেকে আর্দ্র বায়ু স্থলে আসে এবং বৃষ্টিপাত ঘটায়।
১২. স্বাভাবিক ল্যাপ্স রেট
উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা হ্রাস পায়। এই হ্রাসের হারকে স্বাভাবিক ল্যাপ্স রেট বলে।
প্রতি ১ কিলোমিটার (১০০০ মিটার) উচ্চতা বৃদ্ধিতে গড়ে তাপমাত্রা ৬.৫°C কমে।
উদাহরণ
সমুদ্রপৃষ্ঠে তাপমাত্রা ৩০°C হলে, ১ কিমি উচ্চতায় তাপমাত্রা হবে প্রায়:
৩০ - ৬.৫ = ২৩.৫°C
উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে, যেমন দার্জিলিং-এ, তাপমাত্রা কম থাকার প্রধান কারণ উচ্চতা। তাই এখানে শীতল ও নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু দেখা যায়।
মনে রাখবে
পশ্চিমবঙ্গের জলবায়ু উষ্ণমণ্ডলীয় মৌসুমি জলবায়ু।
মৌসুমি বায়ু প্রধান নিয়ন্ত্রক শক্তি।
উত্তরবঙ্গে বৃষ্টি বেশি, পশ্চিমের মালভূমিতে বৃষ্টি কম।
সমুদ্রের প্রভাবে উপকূলে আর্দ্রতা বেশি।
১৩. পশ্চিমবঙ্গের জলবায়ু অঞ্চল
পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক অবস্থান, ভূমিরূপ, উচ্চতা, সমুদ্রের প্রভাব ও বৃষ্টিপাতের তারতম্যের কারণে রাজ্যের জলবায়ুতে আঞ্চলিক বৈচিত্র্য দেখা যায়। নিচে প্রধান জলবায়ু অঞ্চলগুলি আলোচনা করা হল।
১. উত্তর পার্বত্য অঞ্চল
(দার্জিলিং ও হিমালয় অঞ্চল)
- এই অঞ্চলে সর্বাধিক উচ্চতা বিদ্যমান।
- তাপমাত্রা কম এবং বৃষ্টিপাত প্রচুর।
- অরোগ্রাফিক বৃষ্টিপাতের প্রভাব স্পষ্ট।
- চা, ফল, কমলালেবু প্রভৃতি চাষের জন্য উপযোগী জলবায়ু।
২. তরাই-ডুয়ার্স অঞ্চল
- হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত।
- বৃষ্টিপাত বেশি এবং আর্দ্রতা বেশি।
- ঘন বন, চা-বাগান ও নদী-নালার আধিক্য।
- উদ্ভিদ ও প্রাণীর বৈচিত্র্যের জন্য পরিবেশ উপযোগী।
- ধান, চা, পাট, আখ প্রভৃতি চাষ হয়।
৩. উত্তরবঙ্গের সমভূমি অঞ্চল
- জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, উত্তর দিনাজপুর, মালদা প্রভৃতি জেলা।
- বৃষ্টিপাত তুলনামূলকভাবে বেশি।
- ধান, পাট, গম, ভুট্টা, তেলবীজ প্রভৃতি চাষ হয়।
৪. গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চল
(মধ্য ও দক্ষিণবঙ্গের বিস্তৃত অংশ)
- ছত্তিশগড়? — [এই অংশটি ছবিতে অস্পষ্ট]
- নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান, হাওড়া, কলকাতা, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা প্রভৃতি জেলা।
- উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু; বর্ষাকালে প্রচুর বৃষ্টি।
- ধান, পাট, গম, ডাল, তেলবীজ প্রভৃতি চাষ হয়।
৫. পশ্চিমের মালভূমি অঞ্চল
(পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বীরভূম, পশ্চিম বর্ধমানের অংশ)
- উচ্চতা তুলনামূলক বেশি; মালভূমি প্রকৃতি।
- বৃষ্টিপাত কম, গরমে তাপমাত্রা বেশি এবং শীতে শীতল।
- খরার প্রবণতা বেশি; সেচের প্রয়োজন হয়।
৬. উপকূলীয় অঞ্চল
(পূর্ব মেদিনীপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও সংলগ্ন এলাকা)
- বঙ্গোপসাগরের প্রভাব প্রবল।
- আর্দ্রতা বেশি, তাপমাত্রার তারতম্য কম।
- ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের প্রভাব পড়ে।
- ধান, নারিকেল, সুপারি, ফল, চিংড়ি চাষের জন্য উপযোগী।
১৪. বৃষ্টিপাতের আঞ্চলিক বৈচিত্র্য
পশ্চিমবঙ্গে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অঞ্চলভেদে ভিন্ন হয়। ভৌগোলিক অবস্থান, উচ্চতা, সমুদ্রের প্রভাব ও মৌসুমি বায়ুর ধারা এর প্রধান কারণ।
| অঞ্চল | বার্ষিক বৃষ্টিপাত | বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|
| উত্তর পার্বত্য অঞ্চল | ২০০–৮০০ সেমি; কিছু স্থানে ৪০০ সেমির বেশি | অত্যন্ত বেশি বৃষ্টিপাত, অরোগ্রাফিক বৃষ্টিপাত বেশি |
| তরাই-ডুয়ার্স অঞ্চল | ২০০–৬০০ সেমি | আর্দ্র ও অত্যন্ত বৃষ্টিপ্রবণ, ঘন বন ও নদী-নালার আধিক্য |
| উত্তরবঙ্গের সমভূমি | ১৫০–২০০ সেমি | মাঝারি থেকে বেশি বৃষ্টি |
| গাঙ্গেয় সমভূমি | ১৫০–২০০ সেমি | মৌসুমি বৃষ্টির উপর কৃষিনির্ভর অঞ্চল |
| পশ্চিমের মালভূমি অঞ্চল | ১০০–১২৫ সেমি | বৃষ্টিপাত কম, খরার প্রবণতা বেশি |
| উপকূলীয় অঞ্চল | ২০০ সেমি বা তার বেশি | সমুদ্রের প্রভাবে বৃষ্টি ও আর্দ্রতা বেশি |
বৃষ্টিপাতের তারতম্যের কারণ
- অক্ষাংশগত অবস্থান
- উচ্চতা ও অরোগ্রাফিক প্রভাব
- বঙ্গোপসাগরের নিকটতা
- মৌসুমি বায়ুর ধারা ও শক্তি
- ভূমিরূপ (পর্বত, মালভূমি, সমভূমি)
- বনভূমি ও উদ্ভিদ আচ্ছাদন
- মৌসুমি বৃষ্টির উপর নির্ভরশীলতা
- নিম্নচাপ, ঘূর্ণাবর্ত ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব
মনে রাখবে
উত্তরে বেশি বৃষ্টি, পশ্চিমে কম বৃষ্টি।
মৌসুমি বায়ু → প্রধান বৃষ্টির উৎস।
উপকূল → আর্দ্র ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ।
West Bengal
PDF DOWNLODE

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন